দেশজুড়ে মহামারীর মধ্যেও স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট জীবন বাঁচাচ্ছে

ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে অপরিণত ও অসুস্থ নবজাতকদের জরুরি জীবনরক্ষাকারী সেবা দেওয়া হচ্ছে

ইউনিসেফ
স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট
UNICEF Bangladesh/2020/Saeed
29 মে 2020

তাসলিমা বেগম (৩৫) আনন্দচিত্তে তার শিশু ছেলের চোখের দিকে তাকালেন এবং তিনি কৃতজ্ঞ যে কোভিড-১৯ এর এই সংকটের মধ্যেও সে বেঁচে আছে। তার জীবন রক্ষার জন্য সিলেটে ইউনিসেফ সমর্থনপুষ্ট দুটি স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিটের (স্ক্যানু’র) একটিকে কৃতিত্ব দিলেন তিনি।

তাসলিমা বলেন, “তুলনামূলক ঝামেলাহীনভাবেই আমার ছেলেটি হল এবং পরপরই আমরা বাসায় চলে গেলাম। কিন্তু চার দিন পর দেখলাম তার ত্বকে হলদেটে ভাব দেখা যাচ্ছে। আমি দ্রুত তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলাম এবং জানলাম, তার জন্ডিস হয়েছে। তাকে ফটোথেরাপি দেওয়া হল এবং এখন সে সুস্থ হয়ে উঠছে। আমি এখানকার চিকিৎসকদের প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ।”

তাসলিমা সেই সব মায়েদের একজন, যাদের নবজাতক সন্তানরা অসুস্থ ছিল বা সন্তান জন্মের সময় নিজে জটিলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। অন্যান্য মায়েদের তুলনায় তাদের সিলেটসহ বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় দুই জেলায় সেবা প্রদানকারী দুটি স্ক্যানু’র প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

কোভিড-১৯ সংকটে দেশের অধিকাংশ এলাকা লকডাউনে থাকায় প্রত্যন্ত এলাকার অন্তঃসত্ত্বা নারী ও কিশোরী মায়েদের পক্ষে হাসপাতালে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে গেলে ভাইরাস সংক্রমণ ঘটতে পারে ভেবে অনেকেই যেতে ভয় পাচ্ছেন। 

সিলেট এলাকায় ইউনিসেফ সহায়তায় পরিচালিত দুই স্ক্যানু
UNICEF Bangladesh/2020/Elahi
সিলেট এলাকায় ইউনিসেফ সহায়তায় পরিচালিত দুই স্ক্যানুতে উচ্চ মাত্রায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা হয়।

গুরুতর কম ওজন

২৫০ শয্যার মৌলভীবাজার জেলা হাসপাতালে গর্ভকালীন ও সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরবর্তীকালীন সেবা দেওয়া হলেও দুঃখজনকভাবে অনেক শিশুকে বাঁচানো যাচ্ছে না।

গর্ভের সাত মাসে ছেলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে তাকে নিয়ে স্ক্যানুতে ছুটে যান সালমা বেগম (২৩)।

শিশুটির ওজন ছিল মাত্র ১৬০০ গ্রাম, যেখানে তার ওজন হওয়ার কথা প্রায় ৩,০০০ গ্রাম । হাসপাতালে পৌঁছাতে বিলম্ব এবং গুরুতরভাবে কম ওজনের হওয়ার কারণে সালমার সন্তানটি মারা যায়।

ইউনিসেফের মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মির্জা ফজলে এলাহী বলেন, “আমরা শিশুটি ও তার মাকে সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, যেখানে স্ক্যানু রয়েছে, নিয়ে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা রাজি হননি। মূলত কোভিড-১৯ লকডাউন এবং চলাচলে বিধি-নিষেধের কারণে হলেও তাদের সামর্থ্যও ছিল না। শিশুটির বাবা একজন দিনমজুর এবং সেখানে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়া ছিল তার সামর্থ্যের বাইরে ছিল।”

মধ্যরাতে সালমা বেগম তীব্র ব্যাথা অনুভব করলে এই দম্পতি স্ক্যানুতে ছুটে আসেন। ভোররাত ২টার দিকে পৌঁছান তারা। স্বাভাবিকভাবে এ রকমটি ঘটে না, কারণ স্ক্যানুতে সাধারণত জন্মের পর জটিলতা দেখা দেওয়া শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

সবচেয়ে স্বাভাবিক সময়েও এমন রাতে গাড়ি পাওয়াটা যেখানে চ্যালেঞ্জের, সেখানে লকডাউনের মধ্যে তা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

“আমরা খুবই ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমরা একটি গাড়ি পেয়ে যাই। তবে হাসপাতালে পৌঁছাতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে যায়,” বলেন সালমা।

হাসপাতালের কর্মীরা গর্ভকালীন জটিলতায় ভোগা মা ও অসুস্থ শিশুদের জীবন রক্ষা করেন।
UNICEF Bangladesh/2020/Elahi
হাসপাতালের কর্মীরা গর্ভকালীন জটিলতায় ভোগা মা ও অসুস্থ শিশুদের জীবন রক্ষা করেন।

সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলা (১৫ শয্যা) ও সিলেট শহরে (৫০ শয্যা) দুইটি স্ক্যানুর কর্মীদের কাছে জীবন-মৃত্যুর এই লড়াই নিয়মিত ঘটনা।

দুটো প্রতিষ্ঠানই সন্তান জন্মদানে জটিলতা সামাল দেওয়ার জন্য বিশেষায়িত এবং সেখানে নবজাতকের ওজন স্বল্পতা, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য জীবাণু সংক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতার চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।

শিশু বিশেষজ্ঞ (জুনিয়র পেডিয়াট্রিক কনসালট্যান্ট) ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, “অন্তঃসত্ত্বা নারী ও কিশোরী মায়েরা যারা এখানে আসেন তাদের প্রথমে লকডাউনের মধ্যে হাসপাতালে আসার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হয়। এর মধ্যে হাসপাতালে গেলে সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেন।

“কিন্তু একবার তারা এসে পড়লে আমরা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এবং সর্বোচ্চ মাত্রার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে তাদের সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো মানের চিকিৎসা দিতে সচেষ্ট থাকি।”

স্ক্যানুতে চিকিৎসা নেওয়া অসুস্থ বা অপরিণত অনেক শিশুর মা সিলেট ঘিরে থাকা চা বাগানগুলো থেকে এসেছেন। ইউনিসেফ উভয় হাসপাতালেই প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সহায়তা দিচ্ছে, যার মধ্যে মানব সম্পদ, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো বিষয়গুলো রয়েছে। দুটি হাসপাতালেই জন্ম নেওয়া সব শিশুর নিবন্ধন হয়ে থাকে, যাতে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার মতো মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চিত হয়।

সিনিয়র স্টাফ নার্স রুমা রানী দাস বলেন, হাসপাতালের কর্মীরা সবাই কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার জন্য পরিপূর্ণ পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম) পরিধান করেন এবং নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেন।

“হাসপাতালে নারীদের উচ্চ মানের সেবা দেওয়া হয়ে থাকে। তাদের অনেকে প্রসব বেদনা বা গুরুতর অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে আসেন,” বলেন তিনি।