জরুরী প্রসবকালীন সেবা উপকূলীয় গ্রামগুলোতে জীবন রক্ষা করছে

সেবার প্রতি আস্থা বাড়ছে জনগণের

আকরাম হোসেন
আট মাসের প্রসূতি তন্নিমা আখতার
UNICEF Bangladesh/2019/Habib

01 আগস্ট 2019

হাসপাতালের এক জীর্ণ ভবনে অত্যন্ত পরিছন্ন ও নতুন সংস্কার করা কক্ষে গ্রীষ্মের এক সকালে আট মাসের প্রসূতি তন্নিমা আখতার সিনিয়র নাস© আন্জুয়ারা বেগমের সাথে কথা বলছিলেন।

আন্জুয়ারা আবার একজন প্রশিক্ষিত ধাত্রীও। তিনি তন্নিমার ওজন ও পালস্ পরীক্ষা করে তার নোটবুকে বিস্তারিত লিখছেন। এখন তন্নিমার কতটুকু বিশ্রাম নেয়া প্রয়োজন এবং তার খাদ্যাভাসে কি কি পরিবত©ন দরকার সে বিষয়ে উপদেশও দিচ্ছেন। এরপর নাস© তন্নিমাকে বললেন যে, তন্নিমার সবকিছুই ঠিকঠাক আছে বলে মনে হচ্ছে এবং সে আগামী পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা প্রসব করতে পারে।

উপকূলের এক প্রত্যন্ত জেলা পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত প্রসবপূর্ব সেবাকক্ষের বাইরে গর্ভধারণের বিভিন্ন পর্যায়ের নারীরা তাদের সেবার সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হাসপাতালের চারিদিকে এক ঝলক তাকিয়ে যা দেখা যায় তা হলো, এই হাসপাতালে যে ধরনের মাতৃস্বাস্থ্য সেবা দেয়া হচ্ছে, এরূপ প্রত্যন্ত এলাকায় তা খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন।    

“আমাদের হাসপাতালে যদি গত বছর থেকে এ ধরনের সেবার ব্যবস্থা করা না হতো, তবে নিয়মিত সাধারণ এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য গর্ভাবস্থার প্রায় শেষ সময়ে আমাকে তিন ঘন্টা নৌকায় করে নদী পার হয়ে সেবা নিতে যেতে হতো”- প্রসূতি সেবাকক্ষ থেকে সেবা নিয়ে বের হয়ে আসার পর তন্নিমা এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন।

তন্নিমা যিনি নিজেই এই হাসপাতালের একজন নার্স তিনি বলেন যে, তিনি হয়তো তার নিকটবর্তী বরিশাল শহরে গিয়ে সেবা নিতে পারেন যা এ এলাকার অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। “জনগণের অনেকেই এখন এই সেবাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।বিশেষ করে গরীর মানুষ এসব সেবা থেকে বেশ উপকৃত হচ্ছে।”

হাসপাতালের অন্য আর এক পাশের বারান্দায় সজীব বিশ্বাস নামে অপরিছন্ন এক যুবক উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছে। তার মা ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে বলছিলেন যে, প্রসব কক্ষের কাছাকাছি বাবার যাওয়া উচিত নয়, কারন তারা এটাকে খারাপ লক্ষণ বলে মনে করে।”

তার ২১ বছর বয়সী স্ত্রী লিজা আখতারকে প্রসব ব্যাথার কারনে এরই মধ্যে প্রসব কক্ষে নেওয়া হয়েছে। নার্স এবং ধাত্রীরা প্রাচীরের সাথে সংযুক্ত ছবিতে এন্ট্রি দিতে শুরু করেছেন। কয়েক মিনিট পরে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, সি-সেকশান ছাড়াই শিশুটি প্রসব করানো যেতে পারে।

নিশ্চিতভাবেই এক ঘন্টার মধ্যে একটি ছেলে শিশু জন্ম নেয়। কিন্তু নার্সরা একটু উদ্বিগ্ন হলেন এই কারনে যে, শ্বাসকষ্টের কারনে শিশুটি দৃশ্যত অজ্ঞান হয়ে ছিল। এরপর নার্সরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিন্ময় হাওলাদারকে ডাকলেন।

ডা: চিন্ময় হাওলাদার
UNICEF Bangladesh/2019/Habib

“হাসপাতালের নার্সরা জরুরি চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি প্রশিক্ষণ থেকে শিশুর জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যে কি কি করতে হয়, সে সম্পর্কে শিক্ষালাভ করেছে”

ডা: চিন্ময় হাওলাদার

ডা: চিন্ময় হাওলাদার যিনি সম্প্রতি জরুরি প্রসূতি সেবা বিষয়ক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কক্ষে প্রবেশ করলেন এবং দেখলেন যে, শিশুটির স্বাভাবিক শ্বাস নেবার জন্য শ্বাসযন্ত্রের পথটি পরিস্কার করতে হবে। 

কয়েক মিনিট চেষ্টার পরে ডা: চিন্ময় সাফল্যের সাথে শ্বাসযন্ত্রের পথ পরিস্কার করলেন এবং শিশুটি কান্না করতে শুরু করলো।  

“গত এক বছরে মাতৃস্বাস্থ্য ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বেশ আধুনিকায়ন হয়েছে”- প্রায় এক ঘন্টা পরে ডা: চিন্ময় কথাটি বললেন।

তিনি আরো বললেন যে, হাসপাতালের নার্সরা জরুরি চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিল। শিশুর জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যে কি কি করতে হয়, সে সম্পর্কে তারা এই প্রশিক্ষণ থেকে শিক্ষালাভ করেছিল। শিশু শ্বাসকষ্টে ভূগলে কি করতে হবে, এই প্রশিক্ষণ থেকে তারা সে বিষয়েও শিক্ষালাভ করেছিল।

“দৃশ্যমান এসব উন্নতি ছাড়াও, কিছু কিছু অনুশীলনেরও পরিবর্তন হয়েছে।আমাদের প্রশিক্ষণকে ধন্যবাদ। কারন, সন্তান জন্মদানের পর মায়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য কোন ধরণের ঔষুধ প্রয়োজন হয় সেটা এখন আমরা জানি।সংক্রমণ প্রতিরোধে নবজাতককে এখন একটি ইনজেকশান দেওয়া হয়।”

“এখন অধিকাংশ মানুষই আমাদের সেবা ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করে। গত জানুয়ারিতে, এই হাসপাতালে ১৪টি সন্তান প্রসব হয়েছে। কিন্তু এই জানুয়ারিতে আমরা ৩০টি সন্তান প্রসব করিয়েছি। ফ্রেরুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ২৮টি এবং মার্চে এ সংখ্যা ছিল ৪৮টি”- অত্যন্ত গর্বের সাথে হাসিমুখে কথাগুলো বলছিলেন ডা: চিন্ময়।

এদিকে, নতুন বাবা সজীব যিনি তার নবজাতক সন্তানের শ্বাসকষ্টের কারণে কিছুক্ষণ আগে মূষড়ে পড়েছিলেন, তিনি বললেন, “ডাক্তার ও নাস©দের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার জানা নাই।”

২৫ বছর বয়সী একজন যুবকের সমুদ্র সৈকতের পাশের লাউয়া গ্রামে একটি মুদির দোকান আছে। গ্রামটিকে সুরক্ষার জন্য বাঁধ থাকলেও তার আশেপাশে প্রায়ই বন্যার পানি আসে।

তিনি বললেন, “আমরা গরীব এবং এক মুহূর্তের নোটিশে আমরা শহরে যেতে পারি না। আমি যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রসবের জন্য আমার স্ত্রীকে বরিশালে নিয়ে যেতে চাই, তবে আমাকে অবশ্যই লোন নিতে হবে।”

ইউনিসেফকে আরও জানুন