ছয় মেয়ের রোহিঙ্গা শরণার্থী পিতামাতার ২০২০ সাল নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশের বৃহৎ আশ্রয়কেন্দ্রে শোচনীয় অবস্থায় বসবাস করলেও রোহিঙ্গা শরণার্থী এক পিতামাতার ২০২০ সালে তাদের ছয় মেয়েকে নিয়ে উচ্চাকাঙ্খা রয়েছে

অ্যালেস্টার লসন ট্যানক্রিড
UNICEF Bangladesh/2019/Nazzina

01 জানুয়ারি 2020

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ আশ্রয়কেন্দ্রে শোচনীয় অবস্থায় বসবাস করলেও রোহিঙ্গা শরণার্থী হবি আলম ও দিলদার বেগমের ২০২০ সালে তাদের অবিবাহিত ছয় কন্যাকে নিয়ে উচ্চাকাঙ্খা রয়েছে। এই দম্পতির প্রায় সব মেয়ে ১৮ বা তার চেয়ে কম বয়সের। পরিবারের সবাই মিলে বাঁশ ও তেরপলের তৈরী একটি স্কোয়াশ কোর্টের অর্ধেক পরিমান ছোট্র একটি ঘরে বাস করেন। এমন পরিবেশে মেয়েদের বড় করে তোলা সহজ নয়। তাঁদের বসবাসের স্থানে পানি প্রবাহের কোন জায়গা নেই। আর ঘরের বাইরের পায়খানাটি রাতের বেলায় শরণার্থী নারীর একাকী ব্যবহারের জন্যে নিরাপদও নয়।

হবি এবং দিলদার দম্পতির সব মিলে ৮ সন্তান। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছেলে আর বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে এবং তাদেরও সন্তান আছে। এই দম্পতি এবং তাদের পরিবারসহ মোট সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী মায়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যা থেকে রেহাই পেতে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর- অক্টোবর (শরৎ) মাসে পালিয়ে বাংলাদেশে আসে। তারা শুধু কিছু কাপড়-চোপড় আর জীবন নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশের জনবহুল শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়।  

দিলদার বলেন, ”এই ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে ছয় মেয়ে আর নাতি-নাতনি নিয়ে থাকাটা আমার ও আমার স্বামীর জন্য খুবই কষ্টের।” 

তবে এই দম্পতিকে সবসময় যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তা হলো- এতবড় পরিবারের সবার জন্য খাবার জোগান দেওয়া। প্রতি মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মসূচির যেটুকু চাল এবং ডাল তারা পান তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টের।

দিলদার বলেন, “আমার স্বামী ক্যাম্পেই যা কাজ পায় তা করে কিছু উপার্জন করে। কিন্তু প্রতি মাসে যে পরিমাণ খাবার পাই তা দিয়ে মাসের অর্ধেক যায়।” 
তিনি আরও বলেন, “ মাঝে মাঝে আবার রান্নার গ্যাসও শেষ হয়ে যায়। তখন অন্যের গ্যাস স্টোভ ধার করে রান্না করতে বাধ্য হতে হয়।” 

খাবারের চিন্তার পাশাপাশি ২০২০ এর জন্য সন্তানদের পড়াশুনা নিয়েও বড় চিন্তা করতে হচ্ছে হাবি ও দিলদার দম্পতিকে। ছয় মেয়ের মধ্যে তিন মেয়ে ইউনিসেফ এর তত্ত¡াবধানে চলা ওয়ার্ল্ড ভিশন-এর সহযোগীতায় পড়াশুনা করছে।

UNICEF Bangladesh/2019/Nazzina

হবি অন্যান্য রোহিঙ্গা পিতার চেয়ে একটু ভিন্ন কথাই বললেন। শরণার্থী শিবিরে থাকা সবচেয়ে ভালো শিক্ষার পরিবেশ তিনি তার মেয়েদের দিতে চান যাতে করে তারা শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে। 

তিনি বলেন, “এটাই তাদের জন্য ভাল সুযোগ যা তাদের লুফে নিতে হবে। আমার মনে হয় কিছুদিন পরে অন্যান্য রোহিঙ্গা পরিবারও বুঝতে পারবে এবং মেয়ে সন্তানকে পড়ালেখা করতে দিতে চাইবে।”
দিলদার তার স্বামীর কথার সাথে একমত প্রকাশ করে মাথা নাড়িয়ে বলেন, “আমি এটা ভেবেই খুশি যে আমার তিন মেয়ে ইউনিসেফের প্রোগ্রামের (কর্মসূচির) সুবিধা পাচ্ছে। আমার মেয়েরাও কখনো তাদের ক্লাস মিস দেয় না। আমার মনে হয় তারাও এটা খুব উপভোগ করছে।”

এই দম্পতির ১২ বছরের মেয়ে রাজিয়া জানান, তার এবং তার ছোট বোন ফেরদৌস ও সাদেকার ইউনিসেফের ওয়ার্ল্ড ভিশন সেন্টাওে অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরে সবচেয়ে সেরা সময় কাটে। সেখানে তারা সেলাই, হস্তশিল্পের কাজের পাশাপাশি ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষা এবং গণিতসহ জীবন ধারণের গুর”ত্বপূর্ণ বিষয়ও শেখে। তিনি বলেন, “আমি শিক্ষিত হতে চাই যাতে লেখাপড়া শিখে শিক্ষক হতে পারি।” 

তিন মেয়ে প্রতিদিন পরিবারের জন্য পানি আনে এবং সংসারের কাজে মা-কে সহায়তা করে। তাদের মা দিলদারও জানান, তার মেয়েরা এই কঠিন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। 

দিলদার বেগম বলেন, “এটা খুবই কঠিন অবস্থা। বিশেষ করে শিবিরে গোপনীয়তা রক্ষা করা খুবই কঠিন। তারপরও কোনোভাবে আমরা মানিয়ে নিচ্ছি।” তিনি আরো বলেন, “যখন মায়ানমারে ছিলাম তখন আমাদের বড় ঘর ছিলো। কিন্তু সেখানে আমরা শান্তিতে থাকতে পারতাম না। কারণ সবসময় একটা ভয় কাজ করতো।”

“এখন অন্তত আমার সন্তানরা নিজেদের নিরাপত্তায় চিন্তিত না হয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারছে।”

কিন্তু মায়ানমারে ফেরত যাবার ব্যাপারে তার পরিবারের কি চিন্তা ভাবনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে এবং আমার সন্তানরা অন্যান্য বার্মিজ নাগরিকের মতো নিজেদের সম্মান নিয়ে থাকতে পারলে আমরা নিজেদের বাড়িতে ফিরতে চাই।”
 

UNICEF Bangladesh/2019/Nazzina

ছবিতে দিলদার বেগম (উপরে) সাথে তার মেয়ে শাকিলা, ১৮ (কালো জামা পরিহিত), আজিদা (কালো এবং সোনালী জামা পরিহিত), শফিকুর, আমিনা (কমলা রংয়ের জামা পরিহিত), রাজিয়া, ১৩ (গোলাপী রংয়ের জামা পরিহিত), ফেরদৌস, ১২ (সাদা জামা পরিহিত) এবং সাদিকা, ৯ (ফিরোজা রংয়ের জামা পরিহিত)।

ইউনিসেফকে আরও জানুন