খুলনায় নবজাতকের জীবন রক্ষায় স্ক্যানু

অস্ত্রোপচারের সময় রোকেয়া খাতুনকে যে চেতনানাশক ঔষধ দেয়া হয়েছিল তার প্রভাব তিনি তখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু তিনি টের পাচ্ছিলেন যে প্রায় দুই ঘণ্টা কেটে গেছে কিন্তু তার বাচ্চা তখনো কাঁদেনি আর স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাসও নেয়নি।

আকরাম হোসেন
Rokeya Khatun was left with little hope when her newborn did not breathe normally for what seemed like two hours.
UNICEF/Khaliduzzaman

16 অক্টোবর 2019

অস্ত্রোপচারের সময় রোকেয়া খাতুনকে যে চেতনানাশক ঔষধ দেয়া হয়েছিল তার প্রভাব তিনি তখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু তিনি টের পাচ্ছিলেন যে প্রায় দুই ঘণ্টা কেটে গেছে কিন্তু তার বাচ্চা তখনো কাঁদেনি আর স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাসও নেয়নি। এর আগেও তিনি চারবার গর্ভধারণ করেছেন, কিন্তু প্রতিবারই গর্ভপাত হয়ে গেছে। অর্ধচেতন অবস্থায় রোকেয়া যখন প্রায় সব আশাই হারিয়ে ফেলেছিলেন তখন ক্লিনিকের একজন ডাক্তার বললেন যে নবজাতককে এক্ষুনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে।

কথামত বাচ্চাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। এদিকে তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে রোকেয়াকে ওই খালিশপুর ক্লিনিকেই থেকে যেতে হল।

ছয় মাস পর, ২২ বছর বয়সি এই মা তার কন্যা সন্তানকে নিয়ে যেন জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনগুলো কাটাচ্ছেন। নিজের বাড়িতে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে রোকেয়া বলেন, "ওর জন্মের পরের প্রথম কয়টা দিন যেন একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মধ্যে কেটেছে… জীবনের সবচেয়ে ভালো খবরটা শুনলাম যখন ওরা বলল আমার বাচ্চা সুস্থ হয়ে গেছে।"

রোকেয়া তার বাচ্চার নাম রেখেছেন জান্নাতুন্নেসা। আরবী এই শব্দের অর্থ স্বর্গের নারী। "আমাদের কাছে মনে হয় ওর জন্য এই নামটাই সবচেয়ে সঠিক। কারণ ও আসার পরে আমরা যেন বেহেস্ত পেয়েছি।

খুলনা নগরীর অদূরে কারিগর পাড়া এলাকায় রোকেয়া আর তার স্বামী জয়নুল আবেদিনের জরাজীর্ণ টিনের ঘর। বৃষ্টির দিনে টিনের চালের অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। বাড়ির হাড়ি-পাতিল দিয়ে তখন সেই পানি ধরে রাখতে হয়। নগরীর সুযোগ-সুবিধা এখানে নেই বললেই চলে। নির্মাণ শ্রমিক জয়নুল মাঝে মাঝেই কাজ না পেয়ে বেকার বসে থাকেন। রোকেয়ার প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার পর জয়নুল তাকে বাড়ির অদূরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে গুরুতর অসুস্থ নবজাতকের চিকিৎসা দেয়ার জন্য দরকারি যন্ত্রপাতি বা দক্ষ চিকিৎসক ছিলনা।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক একেএম মামুনুর রশিদ বলেন, "আসলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এটিই একমাত্র মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেখানে নবজাতকের বিশেষায়িত সেবা কেন্দ্র (স্ক্যানু) রয়েছে। গুরুতর অসুস্থ নবজাতকের জীবন রক্ষায় এর বিকল্প নেই।"

রোকেয়া বলেন, "আমার কপালটা ভালো যে ডাক্তার আমার বাবুকে ওই হাসপাতালে নিয়ে যেতে  বলেছিল। আমার পরিবারের কেউ ওই স্ক্যানুর কথা জানতো না।"

রোকেয়া পরবর্তীতে ডাক্তারদের কাছে শুনেছেন যে, তার বাচ্চা কম ওজন নিয়ে জন্মেছিল এবং জন্মের সময় ওর যে শ্বাসকষ্ট হয়েছিল তার ফলে অনেক ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারত যদি সময়মতো ওকে নবজাতকের বিশেষায়িত সেবা কেন্দ্রে না নিয়ে যাওয়া হতো।

নগরীর কেন্দ্রে অবস্থিত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রোকেয়াদের বাড়ি থেকে অটোরিকশায় প্রায় এক ঘন্টার পথ। এই হাসপাতাল নবজাতকের সেবায় খুলনা অঞ্চলে এমনই নাম করেছে যে দূর-দূরান্তের জেলা থেকে গুরুতর অসুস্থ শিশুদেরকে চিকিৎসার জন্য এখানে নিয়ে আসা হয়।

হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ নার্স মমতাজ বেগম এই সেবাকেন্দ্রের দায়িত্বে আছেন। রোকেয়ার বাচ্চাকে চিকিৎসা দেয়ার কথা তার এখনো মনে আছে। “বাচ্চাটিকে এখানে আনার পর আমরা যন্ত্রের সাহায্যে ওর শ্বাসনালী পরিষ্কার করে দেই। পরে অক্সিজেন দিয়ে অটোমেটিক রেডিয়েন্ট ওয়ার্মার- এ রাখি যাতে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। মেয়েটি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছিল। তিন দিনের মধ্যে আমরা ওকে ছুটি দিয়ে দিয়েছিলাম।"

নবজাতকের বিশেষায়িত সেবাকেন্দ্র -- স্ক্যানু

ইউনিসেফ এবং কোরিয়ার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা, কোইকার সহায়তায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ৪৮ শয্যাবিশিষ্ট নবজাতকের এই সেবাকেন্দ্রটি চালু হয় যা স্ক্যানু নামে পরিচিত। মা, নবজাতক ও শিশুদের কার্যকর স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নের জন্য নেয়া প্রকল্পের অংশ হিসেবে এ কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়।

ঝকঝকে পরিষ্কার এই নতুন কেন্দ্রটি হাসপাতাল ভবনের চার তলায় শিশু বিভাগের পাশেই করা হয়েছে। এখানে নার্সদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা, ডাক্তারের কক্ষ, হাত ধোয়ার জায়গা, ক্যাঙ্গারু মাতৃসেবা দেয়ার জায়গা, নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা, এবং হাসপাতালের ভেতরে এবং বাইরে জন্ম নেয়া নবজাতকদের পৃথক কক্ষে রাখার ব্যবস্থা আছে।

শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান মামুনুর রশীদ বলেন, "আমাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা এখান থেকে শিখতে পারছে কিভাবে এরকম একটা কেন্দ্র চালাতে হয়।"

তাঁর মতে, ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যু বন্ধ করার জন্য সারাদেশে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন।

নবজাতকের জীবন রক্ষা

বিশেষজ্ঞদের মতে, শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি শিশুমৃত্যু ঘটে জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে। এর সবচেয়ে বড় কারণগুলো হচ্ছে সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট, শ্বাসযন্ত্রে তীব্র সংক্রমণ, জন্মগত অস্বাভাবিকতা ও জন্মের সময় আঘাত পাওয়া। এধরনের গুরুতর অসুস্থ নবজাতকের জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ বিশেষায়িত সেবা এবং পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক পরিবেশ।

অধ্যাপক রশিদ বলেন, "স্ক্যানু চালু করে এটা পরিষ্কার বোঝা গেছে যে এধরনের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।"

দেশে বাল্যবিবাহের আধিক্য, কিশোরী অবস্থায় মা হয়ে যাওয়া, প্রশিক্ষিত ধাত্রী ছাড়া বাড়িতেই প্রসব করা এবং এসবের ফলে বিভিন্ন জটিলতার শিকার হওয়ার ঘটনা বিরল নয়।

রোকেয়া খুলনার একটি কলেজে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিনি বলেন, "আমি পড়ালেখা শেষ করে একটি চাকরি করতে চাই, যাতে আমার মেয়েকে ভালো পরিবেশে বড় করতে পারি। অনেক কষ্টের পরে ওকে আমরা পেয়েছি।"

আরো তথ্যের জন্য ভিডিওটি দেখুন

ইউনিসেফকে আরও জানুন