কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের ভিটামিন-এ খাওয়ানো হচ্ছে

বিশ্বব্যাপী চলমান মহামারীর ঝুঁকি কমিয়ে আনতে ঘরে ঘরে গিয়ে শুরু হয়েছে এক-মাসব্যাপী পুষ্টি কার্যক্রম সপ্তাহ-এর প্রচারনা

রাশাদ ওয়াজাহাত লতিফ
বাংলাদেশ। চার বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা শিশুকে লাল ভিটামিন-এ-এর সম্পূরক ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে
UNICEF Bangladesh/2020/Lateef
03 সেপ্টেম্বর 2020

কোভিড-১৯ যেহেতু বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষকে আক্রান্ত করে চলেছে; সে কারনে বিশ্বের বৃহত্তম এবং সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী আশ্রয়শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এসব আশ্রয়শিবিররে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শিশুরা যেন সুস্থ থাকে এবং তাদের অভিভাবক এবং সেবাদানকারীদের কাছে কোভিড-১৯ ও নিজেদের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার উপায় সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে ইউনিসেফ তার সহযোগীদের সাথে একযোগে কাজ করছে।

২০২০ সালের জুলাই মাসে চার-সপ্তাহের ভিটামিন-এ এর সম্পূরক ক্যাপসুল খাওয়ানো সম্পর্কিত প্রচারাভিযাণের অধীনে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ লক্ষ ৫৪ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শিশুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এসব প্রচারাভিযানে মারাত্মক অপুষ্টির শিকার শিশুদের পরীক্ষা করা এবং কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে নবজাত এবং অল্প বয়সী শিশুদের খাওয়ানো ও তাদের যত্ন নেওয়া সম্পর্কিত বার্তাও দেওয়া হচ্ছে ।

বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির
UNICEF Bangladesh/2020/Lateef
বাসস্থানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং যে মাটির উপর আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নির্মিত হয়েছে সেগুলোসহ ক্রমাগত বর্ষার বৃষ্টিপাত বিভিন্নভাবে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

একটি সাধারণ বছরে, মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগে এমন শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন-এ-এর সম্পূরকবিতরণ এবং তাদের পরীক্ষা করার জন্য ইউনিসেফ এবং পুষ্টি খাত বছরে দুই বার পুষ্টি অ্যাকশন সপ্তাহ (এনএডব্লিউ) পরিচালনা করে। তবে, বড় ধরনের জনসমাগমের সাথে জড়িত বর্তমান ঝুঁকির কারণে এই প্রচারাভিযানটিকে নতুন করে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে করে তা কোভিড-১৯ এর ফলে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ এবং পরিস্থিতির সাথে আরও ভালভাবে খাপ খাওয়াতে পারে।

কক্সবাজারের ইউনিসেফের পুষ্টি ব্যবস্থাপক করণভীর সিং বলেন, “এ বছর পুষ্টি অ্যাকশন সপ্তাহ-এর জন্য আমাদের পরিকল্পনাগুলো দ্রুত সংশোধন করতে বাস্তবায়নকারী অংশীদারদের সাথে আমাদের কাজ করতে হয়েছিল”। তিনি আরও জানান, “এ কাজের সাথে জড়িত প্রত্যেককে আরও সুরক্ষিত রাখতে এক মাসব্যাপী বাড়ি বাড়ি প্রচার কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। মহামারী চলাকালীন সময়ে বিশ্বজুড়ে ভিটামিন-এ পরিপূরক প্রচারাভিযানের অল্প কয়েকটির মধ্যে এটি একটি। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে বর্ষার ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট বর্তমান ঝুঁকিকে বিবেচনা করে এই প্রচারাভিযান থেকে প্রাপ্ত ফলাফল আমাদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। আমরা ৫-৫৯ মাস বয়সী ৯৭ শতাংশ শিশুর কাছে পৌঁছেছি।”

বাংলাদেশ। ইউনিসেফ সমর্থিত একজন কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক ভিটামিন-এ-এর সম্পূরক বিতরণ করছেন
UNICEF Bangladesh/2020/Lateef
ইউনিসেফ সমর্থিত একজন কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক ভিটামিন-এ-এর সম্পূরক বিতরণ এবং শিশুদের অপুষ্টি পরীক্ষার জন্য বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন।

ভিটামিন-এ- সম্পূরক এবং অপুষ্টি পরীক্ষা পরিচালনা করা ছাড়াও বাড়ি বাড়ি যাওয়া এসব কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবীরা পরিবারগুলোকে পুষ্টি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেন। বার্তাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, অপুষ্টিজনিত বিপদের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং শিশুদের আত্মঘাতী মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে কার্যকর পদক্ষেপের বিষয়ে পরামর্শ প্রদান।

বাংলাদেশ। মারাত্মক অপুষ্টিতে ভূগছে এমন একটি রোহিঙ্গা শিশু
UNICEF/UN0146005/LeMoyne
মারাত্মক অপুষ্টিতে ভূগছে এমন একটি শিশু ইউনিসেফের সহযোগিতায় পরিচালিত শিশুদের ওষুধ খাওয়ানোর জন্য নির্ধারিত সেন্টারে পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তার মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে।

সময়মতো শিশুদের অপুষ্টির চিকিৎসা করা না হলে শিশুদের উপর তার স্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে এবং এতে করে শিশুর মারা যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। শিশুদের জীবনের প্রথম দুই বছর পুষ্টিহীনতা থেকে তার শারীরিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের যে ক্ষতি হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা স্থায়ী হয়।

সম্পদ যেখানে অত্যন্ত সীমিত এমন পরিবেশে বাস করার পরেও এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যে, আশ্রয়শিবিরে বসবাসকারী পিতামাতা এবং সেবাদানকারী তাদের শিশুদের স্বাস্ব্য এবং কল্যানের ক্ষেত্রে এই অপুষ্টির আজীবন পরিণতি সম্পর্কে জানেন।

বাংলাদেশ। মায়ের কোলে থাকা এক রোহিঙ্গা শিশুর বাম হাতের উপরের অংশের পরিধি পরিমাপ করা হচ্ছে।
UNICEF Bangladesh/2018/Sujan
মায়ের কোলে থাকা এক শিশুর বাম হাতের উপরের অংশের পরিধি পরিমাপ করা হচ্ছে।

মায়েদের এবং প্রাথমিক সেবাদানকারীদের তাদের বাচ্চা এবং অল্প বয়সী শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো এবং বয়স-উপযুক্ত খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল এই প্রচারাভিযানে। একজন শিশুর হাতের মাঝামাঝি থেকে উপরের অংশ (এমইউএসি) পর্যন্ত কীভাবে পরিমাপ করতে হয় সে বিষয়ে মায়েদের এবং প্রাথমিক সেবাদানকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। একজন শিশুর পুষ্টির অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য হাতের এই পরিমাপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। ছোট শিশুরা যেন বাড়িতে বসে এই পরীক্ষা করতে পারে তা নিশ্চিত করতে মায়েদের নেতৃত্বে পরিমাপ করার বিষয়টি আশ্রয়শিবিরে চালু করা হয়েছিল। মহামারীর কারণে ধারণ ক্ষমতার উপর চাপ পড়বে বলেই এ পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল।

মারাত্মক অপুষ্টি পরীক্ষা করার অংশ হিসাবে রোহিঙ্গা শিশুর হাত পরিমাপ করা হচ্ছে।
UNICEF Bangladesh/2020/Lateef
মারাত্মক অপুষ্টি পরীক্ষা করার অংশ হিসাবে শিশুর হাত পরিমাপ করা হচ্ছে।

আশ্রয়শিবিরগুলোতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার বিস্তার রোধে বিধিনিষেধের কারণে মানবতা কর্মীর সীমিত উপস্থিতি রয়েছে। এই প্রচারাভিযানের অংশ হিসাবে অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশুদের পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং এসব শিশুদের মধ্যে মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে এমন ২১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি শিশুকে সনাক্ত করা হয়েছিল। এদের মধ্যে সাত হাজারেরও বেশি শিশুকে সম্পূর্ণরূপে নতুন হিসাবে সনাক্ত করা হয়েছিল।

দুই বছর বয়সের একটি রোহিঙ্গা শিশুকে লাল ভিটামিন-এ সম্পূরক ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে।
UNICEF Bangladesh/2020/Lateef
দুই বছর বয়সের একটি শিশুকে লাল ভিটামিন-এ সম্পূরক ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে।

চার বছর বয়সী এক শিশুর মা জাহানারা বেগম বলেন, “আমার পরিবার এর আগে করোনভাইরাস সম্পর্কে জানত না। কমিউনিটির স্বেচ্ছাসেবীরা আমাদেরকে এগুলো বলেছে।” তিনি আরও বলেন, “আমার ভাল লাগছে যে, তারা আমার ছেলেকে দেখতে এসেছে। এ কারনেই আমি এখন বুঝতে পারছি যে, আমার ছেলেটি বেশ শক্ত-সমর্থ আছে। যদি সে শক্তিশালী থাকে তবে আমি মনে করি, যে কোনও রোগের বিরূদ্ধে সে যুদ্ধ করতে পারবে।”

বাংলাদেশ। মারাত্মক অপুষ্টি পরীক্ষার পরে জাহানারা বেগম তার ছেলের হাত ধরে রয়েছে।
UNICEF Bangladesh/2020/Lateef
মারাত্মক অপুষ্টি পরীক্ষার পরে জাহানারা বেগম তার ছেলের হাত ধরে রয়েছে।

জাহানারা বেগম সহ এবং আরও অনেকে শুধুমাত্র ভিটামিন-এ-এর সম্পূরক থেকেই উপকৃত হননি, তারা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জীবন রক্ষাকারী তথ্যও পেয়েছেন।

কমিউনিটি পর্যায়ের সচেতনতার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে ইউনিসেফ যেমন কাজ করছে; তেমনিভাবে শুধু কোভিড-১৯ থেকেই নয় বরং অন্যান্য যে কোনও রোগ থেকে বাঁচার জন্য শিশুরা যেন যথেষ্ট শক্তিশালী থাকে সেটাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।