কোভিড-১৯ মহামারিকালে রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েদের নীরব সংকট প্রতিরোধ

দেশব্যাপী লকডাউন রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি নারী ও মেয়েদের জন্য লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

কেটি জিন
রোহিঙ্গা শরণার্থী
UNICEF/UNI319801/Jean
30 এপ্রিল 2020

কক্সবাজার, বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশের কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ও কোভিড-১৯ মহামারি প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত সাড়ে ৮ লাখ রোহিঙ্গা যে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে, তাদের কাছাকাছি বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারগুলোও একইরকম উদ্বিগ্ন। আর তাদের উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা অত্যন্ত দরিদ্র এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সামাল দিতে পারবে না।

মার্চ মাসে শুরু হওয়া দেশব্যাপী লকডাউন এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছেও একটি অর্থনৈতিক ধাক্কা হিসাবে এসেছে। তবে বাসায় থাকার অনুরোধ কিছু শরণার্থীর মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, যদিও কোভিড-১৯ এর সঙ্গে এর সম্পর্ক সামান্যই।

তারা একটি অসহায় পরিস্থিতি থেকে এসেছে এবং লকডাউন তাদের আরও অসহায় অবস্থায় ফেলছে।

অনেক নারী ও মেয়েও লকডাউন থাকা অবস্থায় লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা (জিবিভি), বিশেষ করে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতা, যৌন নীপিড়ন এবং অন্য ধরনের নির্যাতন বৃদ্ধির বিষয়টি সহজেই অনুমেয়।

কক্সবাজারের একটি শিবিরে ‘নারী ও মেয়েদের জন্য নিরাপদ স্থান’ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সুমি বলেন, “তারা একটি অসহায় পরিস্থিতি থেকে এসেছে এবং লকডাউন তাদের আরও অসহায় অবস্থায় ফেলছে।”

ইউনিসেফ কক্সবাজার জেলাতে এ ধরনের ১৫টি নিরাপদ স্থানে সহায়তা দেয়। নিরাপদ স্থানগুলো সাধারণত দলগত কাউন্সেলিং, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সাক্ষরতা সেশন, মনোসামাজিক সহায়তা ও ঘটনা ব্যবস্থাপনার মতো সুরক্ষা সেবাসমূহ প্রদান করে। এই সেবাগুলো রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি নারী ও মেয়েদের জন্য বরাদ্দ; যারা ঝুঁকির মুখে রয়েছে এবং/অথবা লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা, পাচার, শিশুবিয়ে ও অন্যান্য ক্ষতিকর আচরণের শিকার হয়ে বেঁচে আছেন। তবে দেশব্যাপী লকডাউন এবং অপরিহার্য নয় – এমন সেবাসমূহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে, নিরাপদ স্থানগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে, অন্তত যেভাবে এগুলো পরিচালিত হতো তা ব্যাহত হয়েছে।

ইউনিসেফ

বন্ধ, তবে একেবারে বন্ধ নয়

২০১৯ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার যেসব অভিযোগ এসেছিল তার সিংহভাগই ছিল নারীদের এবং এধরনের ঘটনাগুলো সাধারণত সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের বাড়িতে অথবা অপরাধীর বাড়ির ভেতরেই ঘটেছিল। উভয়ক্ষেত্রেই পরিবারের অন্য সদস্যরা সাধারণত বাড়িতে উপস্থিত থাকেন, যা হুমকির আরও একটি দিক নির্দেশ করে। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের ওপর এধরনের ঘটনা মানসিক প্রভাব ফেলে।  

তবে দেশব্যাপী লকডাউন সত্ত্বেও যাদের সহায়তা প্রয়োজন সেসব নারী ও মেয়ের জন্য মনস্তাত্ত্বিক এবং স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সেবা ও কাউন্সেলিং চালু রয়েছে।  

সুমি বলেন, “মানুষ আতঙ্কিত, কারণ তারা সেবাসমূহ ও যত্ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে আছে। তবে আমরা এখনও এখানে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এটি তাদের অনেক সাহায্য করছে।”

সুমি যে কেন্দ্রে কাজ করেন, সেই কেন্দ্রে নারীদের নেতৃত্ব দেওয়া দলের পাঁচ সদস্য এবং পাঁচ নারী স্বেচ্ছাসেবক আশেপাশের কমিউনিটিতে নিয়মিত বাড়ি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে স্বেচ্ছাসেবীরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশাবলী অনুসরণ করে কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছে দেন।

মানুষ আতঙ্কিত, কারণ তারা সেবাসমূহ ও যত্ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে আছে। তবে আমরা এখনও এখানে সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

তবে মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়া স্বেচ্ছাসেবীদের শুধু কোভিড-১৯ সম্পর্কিত বিষয়েই নয়, একইসঙ্গে বিদ্যমান লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলা সংক্রান্ত সেবার তথ্যসেবা প্রদান এবং এতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো কীভাবে এই সেবাসমূহ পেতে পারে সে সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোরও সুযোগ করে দেয়। নির্যাতনের পর বেঁচে থাকা মানুষগুলো যাতে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সেবা পায় তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের কাছে প্রকাশ করা তথ্যগুলো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিরাপদে ঘটনা ব্যবস্থাপকদের কাছে পৌঁছে দেয়।

সুমি বলেন, “কমিউনিটির সঙ্গে যত বেশি সম্ভব তথ্য আদান প্রদানের চেষ্টা করি আমরা।”

কক্সবাজারে ইউনিসেফের সঙ্গে কর্মরত লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা বিশেষজ্ঞ গার্ট্রুড মুবিরু স্বীকার করেছেন যে, এই মুহূর্তে শিবিরগুলো ঘিরে মানবিক প্রচেষ্টার একটি প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে কোভিড-১৯ প্রতিরোধ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সহায়তা প্রয়োজন এমন নারী ও মেয়েরা কোনো সহায়তা পাবে না, বিশেষ করে যেহেতু ইউনিসেফ রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি নারী ও মেয়েদের ক্ষতির কারণ হচ্ছে এমন সুরক্ষামূলক বেশ কিছু বিষয় পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছে।

গার্ট্রুড বলেন, “নারী ও মেয়েদের জন্য নিরাপদ স্থানগুলোতে [করোনাভাইরাসের বিস্তার কমানোর জন্য] দলীয় কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে, তবে নতুন এবং বিদ্যমান লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ সেবাসমূহ প্রদান অব্যাহত রয়েছে।”

রোহিঙ্গাদের মতো ঝুঁকির মুখে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য কোভিড-১৯ মহামারিটি বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং। তবে যদি শরণার্থী জনগোষ্ঠী লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার  নীরব শিকার হওয়া এড়াতে চায়, তবে এ ধরনের সুরক্ষা কর্মসূচিকে অবশ্যই অগ্রাধিকার হিসেবে রাখতে হবে।


লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা কর্মসূচিগুলো কানাডা, কেএফডব্লিউর উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে জার্মানি, কোরিয়া প্রজাতন্ত্র, জাপান এবং যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের (ডিএফআইডি) পাশাপাশি সুইস ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন (এসডিসি), জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা এবং ইউএসএইডের বৈদেশিক দুর্যোগ সহায়তা কার্যালয়ের (ওএফডিএ) যৌথ তহবিলে পরিচালিত।

অ্যাকশনএইড, ব্র্যাক, কেয়ার, ডেনিশ চার্চ এইড (ডিসিএ) এবং ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটিসহ ইউনিসেফের সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে নারী ও মেয়েদের জন্য নিরাপদ স্থান পরিচালনায় সহায়তা প্রদান করে।