কোভিড-১৯ এর মধ্যে মৌসুমী বন্যা লক্ষ লক্ষ শিশুকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে

বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের ৪৪ লক্ষের বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক শিশু, সাম্প্রতিক মৌসুমী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

নুসরাত শবনম তূর্ণা
বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার আবাদযোগ্য জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
UNICEF Bangladesh/2020/Zhantu
24 আগস্ট 2020

বাংলাদেশের বেশিরভাগ অংশে মৌসুমী বন্যার প্রকোপ কমার তেমন কোন লক্ষণ দেখা না দেওয়ায় পানির তীব্র স্রোতে বাড়িঘর, আবাদী জমি এবং স্কুল সহ অন্যান্য অবকাঠামো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া অব্যাহত রয়েছে।

মাইলের পর মাইল জুড়ে এখন শুধুই পানি আর পানি। জমিগুলো তলিয়ে যাওয়ায় এখন সেগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। এটিকে কোনও চলচ্চিত্রের সূচনার মতো শোনাতে পারে । তবে, বাংলাদেশের উত্তরে অবস্থিত কুড়িগ্রাম জেলার ধরলা নদী অববাহিকায় বসবাসকারী একটি পরিবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে সংগ্রামের সত্য কাহিনী এটি।

চার বছর বয়সী রবিউল ইসলামের বাবা সিরাজুল ইসলাম কুড়িগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যার শিকার । তিনি এবং তার পরিবার এই বন্যায় তাদের ঘরবাড়ি এবং জীবিকা হারিয়েছেন। এতে করে তাদের একমাত্র পুত্র রবিউলের ভবিষ্যত অশ্চিয়তার মধ্যে পড়েছে।

বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে শিশুরা শুধু ডুবে যাওয়া, সাপের কামড়, ও ডায়রিয়ার মতো তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মধ্যেই পড়ছে না, তারা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ঝুঁকিসহ সুরক্ষা ঝুঁকির মধ্যেও পড়ছে।

বিগত দিনের বড় বড় বন্যার মতো, এ সময় বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হওয়ায় মানুষ ক্ষুধা ও অসুস্থতায় ভূগছে। এছাড়াও, বাস্তুচ্যুত মানুষ তাদের নিজেদের পাশাপাশি সন্তানদের জন্য কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। অবশেষে জনাকীর্ণ এবং নিরাপত্তাহীন বস্তিতে তারা বসবাস করতে শুরু করছে। রবিউলের মতো শিশুদের ভবিষ্যত এভাবেই বিবর্ণ হয়ে পড়ছে। 

এবারের বর্ষায় অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট সাম্প্রতিক বন্যায় বাংলাদেশের ৩০টি জেলার কয়েক লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ১৫টি জেলায় মাঝারি থেকে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। ২২ লক্ষ শিশু সহ ৫৪ লক্ষের বেশি মানুষ এ বারের মৌসুমী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ। সিরাজুল পানির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
UNICEF Bangladesh/2020/Zhantu
নিজের বাড়ির সামনে সন্তান রবিউলকে কোলে নিয়ে সিরাজুল পানির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

শিশুরা ঝুঁকিতে রয়েছে

কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে বন্যাদুর্গত এলাকায় বসবাসরত মানুষের এখন ফসলের ক্ষতি হচ্ছে এবং তারা তাদের ব্যবহার্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও ঠিকমতো পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে যেখানে মানুষ পর্যাপ্ত খাবার বা নিরাপদ পানীয় জল পাচ্ছে না, সেখানে কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষিত থাকা তাদের জন্য বেশ কঠিন।

এরকম পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাস শিশুদের জীবনের জন্য একমাত্র হুমকি নয়। ফুলে ফেঁপে উঠা বন্যার পানি এবং আশেপাশের জলাশয়ে শিশুদের ডুবে যাওয়া হলো বন্যার সময় অভিভাবকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয়।

বন্যা এবং কোভিড-১৯ এর ফলে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জের মাঝে, সিরাজুল ইসলাম এবং তাঁর স্ত্রী রুখসানা বেগমের কাছে তাদের ছেলে রবিউলের সুরক্ষাই এখন সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।

সিরাজুল বলেন, “এমন কোনও মূহুর্ত নেই যখন আমি আমার ছেলেকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি না। পানির কারণে আমি তাকে কোল থেকে নামাতে পারি না। আমি তাকে খেলতে দিতে পারি না এবং সবসময় তাকে আমার সাথে রাখতে হয়।”

“এমন কোনও মূহুর্ত নেই যখন আমি আমার ছেলেকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি না। পানির কারণে আমি তাকে কোল থেকে নামাতে পারি না। আমি তাকে খেলতে দিতে পারি না এবং সবসময় তাকে আমার সাথে রাখতে হয়।”

বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও ইনজুরি সমীক্ষা, ২০১৬ এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৯ হাজারেরও বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এ সঙ্ক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা গড়ে প্রতিদিন ৫৩ জন। সিরাজুল এবং রুখসানা তাই তাদের সন্তানকে চোখের আড়াল হতে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না।

হতাশার সুরে সিরাজুল বলেন, “আমার কোন কাজ নেই। এমনকি আমি বাজারেও যেতে পারি না। আমরা এখন অনেক বিপদের মধ্যে আছি। আমরা কীভাবে বেঁচে থাকবো তাও জানি না।”

 

বাস্তুচ্যুত ও আশাহত

পানির স্তর বাড়তে থাকায় সিরাজুলের পরিবার এখন যেখানে বাস করছে, সেখানে তৈরি করা আবাসস্থলটিও পানির নীচে তলিয়ে যাচ্ছে। তারা কী করার পরিকল্পনা করছে এমনটি জানতে চাইলে উদাস নয়নে সিরাজুল উত্তর দেয়: "আমি জানি না"।

পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার কারনে তারা তাদের তৈরি করা বাসস্থানে আর থাকতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে তাদের সরকারী আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরিত হওয়ার দরকার। কিন্তু এর জন্য অনেক অনুমতির প্রয়োজন হয়। আর এই অনুমতি পাওয়াও বেশ কঠিন।

বাংলাদেশ। সিরাজুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী রুখসানা বেগম ও ছেলে রবিউল
UNICEF Bangladesh/2020/Zhantu
সিরাজুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী রুখসানা বেগম ও ছেলে রবিউলের বাড়ি এখন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে সিরাজুলের কোনও কাজ নেই এবং অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য নৌকা ভাড়া করার মতো অর্থও তার পরিবারের নেই। বাংলাদেশে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মানুষের বাস্তব চিত্র এভাবেই তারা তুলে ধরেছে।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের বিপর্যয় ও তার ফলে সৃষ্ট জরুরি অবস্থা বাংলাদেশ যখন ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছে এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যখন কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে লড়াই করছে, ঠিক তখনই বর্তমান বন্যা আঘাত হেনেছে। 

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে এবং এই সংকট থেকে উত্তোরণের জন্য লড়াই করছে, ঠিক সেই সময় এই মৌসুমী বন্যার ফলে সৃষ্ট অনাহারের কারণে আরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। অনেক বেশি মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছে এমন জনাকীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি এবং এতে করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

 

জরুরি পরিস্থিতিতে সেবাসমূহ চালু রাখা

এরকম পরিস্থিতিতে ইউনিসেফ কমিউনিটি রেডিও’র সাহায্যে বন্যা বিষয়ে সচেতনতা ও শিশুদের সুরক্ষা এবং মাস্ক ব্যবহার করা ও আশ্রয়কেন্দ্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কিত বার্তা প্রচার করেছে।

জনগণকে কোভিড-১৯ এবং অন্যান্য রোগ থেকে নিরাপদ রাখতে সহায়তা করার জন্য সরকারী ও বেসরকারী অংশীদারদারদের সাথে নিয়ে ইউনিসেফ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কিত উপকরণ সরবরাহ করতে কাজ করছে।

গত ২০-২২ জুলাই ২০২০-এ গৃহীত যৌথ চাহিদা মূল্যায়নে মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন হিসাবে পানি, খাদ্য এবং সুরক্ষাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পানি পরিশোধন ট্যাবলেটের মাধ্যমে নিরাপদ পানি বিতরণ এবং জীবাণুনাশক বিতরণে ইউনিসেফ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরকে সহযোগিতা করছে। এছাড়াও নলকূপ ও ল্যাট্রিন মেরামত বা নতুনভাবে স্থাপনে ইউনিসেফ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরকে সহযোগিতা করছে। 

চিকিৎসা ও পুষ্টি-পণ্য, নিরাপদ পানি এবং সাস্থসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে এবং জরুরী পরিস্থিতির চাপ মোকাবেলায় সহায়তা করার জন্য শিশুদের শিক্ষা এবং বিনোদন উপকরণ সরবরাহ করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টার প্রতি ইউনিসেফ সমর্থন অব্যাহত রাখবে।