কমিউনিটিগুলো জেগে উঠছে: কোভিড-১৯ মোকাবিলা করছে এবং ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে

ইউনিসেফ গাজীপুর জেলায় মূল পরিষেবাগুলো জোরদার এবং সুবিধাবঞ্চিত কমিউনিটিগুলোর ক্ষমতায়ন করছে

ইউনিসেফ
Bangladesh. Volunteer
UNICEF Bangladesh/2021/Satu
29 এপ্রিল 2021

৩৫ বছর বয়সী শিরিন আক্তারের ব্যস্ত দিনটি শুরু হয় ভোর ৫টায়। ঘরের কাজকর্ম সারার পর তিনি সকাল ৮টায় ইউনিসেফের সহযোগী ভিলেজ এডুকেশন রিসোর্স সেন্টারের (ভার্ক) জন্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার লক্ষ্যে বেরিয়ে পড়েন।

শিরিন বাংলাদেশের গাজীপুর জেলায় কাজ করেন, যেখানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বসবাস। গাজীপুরে শহর ও গ্রামীণ উন্নয়ন – উভয় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পোশাক শিল্পের জন্য শহরটি একটি প্রধান শিল্পকেন্দ্র, তবে দুর্বল পরিকল্পনার ফলে শহরে বস্তির উত্থান এবং পরিবেশের অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে গাজীপুর জেলায় গ্রামীণ ও কৃষিজ সম্প্রদায়ের বসবাস, যেখানে অনেক পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে।

 

বৈশ্বিক মহামারির পর্যায়ক্রমিক প্রভাবসমূহ

কোভিড-১৯ এবং সেই সঙ্গে লকডাউন ব্যবস্থা গাজীপুরের পোশাক শ্রমিক, নগর বস্তিবাসী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেক কারখানা শ্রমিক তাদের চাকরি হারিয়েছে এবং দিনমজুরির ভিত্তিতে বেঁচে থাকা জনগোষ্ঠী তাদের জীবিকার সংস্থানে সংগ্রাম করছে।

কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে পুষ্টি ও টিকাদান পরিষেবা হ্রাস পায়। ২০২০ সালের এপ্রিলে তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শনাক্তের হার ৯৯ শতাংশ কমে যায়, যার মধ্যে গাজীপুর জেলায় মাত্র ৬৫টি পরীক্ষা হয়েছিল। অথচ এখানে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মাসিক পরীক্ষার সংখ্যা ছিল ৬ হাজার।

২০২০ সালের এপ্রিল মাসে দেশব্যাপী, টিকাদান সেবা প্রাপ্তির হার প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পায়, যা অপরিহার্য মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার ওপর কোভিড-১৯-এর পরোক্ষ প্রভাবের আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

একই সময়ে, স্কুলগুলো বন্ধ থাকা এবং পড়াশোনা, দৈনন্দিন মিথস্ক্রিয়া ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা জাল থেকে বঞ্চিত হওয়ায় শিশুর সুরক্ষা ঝুঁকিগুলো বেড়ে গেছে। পরিবারগুলো তীব্র মানসিক চাপের মুখে পড়েছে। নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

 

কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বহুখাত ভিত্তিক পদক্ষেপ

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউনিসেফ গাজীপুরে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ৩ লাখ ১৬ হাজার মানুষের জন্য স্থিতিস্থাপক এবং সমন্বিত অপরিহার্য পরিষেবার ব্যবস্থা করতে সুইডেন সরকারের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ‘সিডা’র সঙ্গে কাজ করছে।

ইউনিসেফের ময়মনসিংহ ফিল্ড অফিসের প্রধান ওমর ফারুক বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সেবা প্রদানকেন্দ্রে পরিষেবাগুলো অঙ্গীভূত করা। গর্ভবতী নারীরা যখন কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকে যাবেন তখন তারা যাতে একসঙ্গে স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি – উভয় ধরনের পরিষেবা গ্রহণ করতে পারেন তা আমরা নিশ্চিত করছি। আমরা লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা ও শিশু সুরক্ষা সম্পর্কিত বিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণও দিয়েছি, যাতে তারা ঝুঁকিতে থাকা নারী ও শিশুরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এলে তাদের সহায়তা ও পরামর্শ সেবা দিতে পারেন।”

সমন্বিত অপরিহার্য পরিষেবা গ্রহণে প্রচারণা চালাতে এবং জন্ম নিবন্ধন, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, শিশু সুরক্ষা এবং কোভিড-১৯-এর সময়ে নিরাপদে পরিষেবা গ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবারগুলোকে পরামর্শ প্রদানে ইউনিসেফ এবং সহযোগী ভার্ক ৩৩৪ জন কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শিরিন বলেন, “আমি গর্ভবতী মায়েদের সাথে কথা বলি এবং নিশ্চিত করি যাতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান, আমি শিশুদের টিকাদান কার্ড পরীক্ষা করি এবং শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে কিনা তা আমি পরীক্ষা করি। এই গ্রামগুলোতে কখনোই পুষ্টির বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়নি, তাই মায়েরা তাদের সন্তানের অবস্থা জানতে আগ্রহী।”

৩৫ বছর বয়সী শিরিন আক্তার ৭ মাস বয়সী শ্রেয়া রানি দাসের অগ্রগতি পরীক্ষার জন্য তার বাহুর পরিধি মাপছেন।
UNICEF Bangladesh/2021/Satu
৩৫ বছর বয়সী শিরিন আক্তার ৭ মাস বয়সী শ্রেয়া রানি দাসের অগ্রগতি পরীক্ষার জন্য তার বাহুর পরিধি মাপছেন। শ্রেয়া তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। তবে ইউনিসেফ-সিডা প্রকল্পের সহায়তা সে এখন সুস্থ হওয়ার পথে।

পরিবর্তন আনয়নকারী তরুণদের পেছনে বিনিয়োগ করা

২০ বছর বয়সী মদিনা আক্তারের মতো স্বেচ্ছাসেবীরা পরিবার ও কিশোর-কিশোরীদের মাঝে সমতা এবং স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের বিষয়গুলো প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মদিনা বলেন, “আমি বাবা-মায়েদের তাদের ছেলে ও মেয়েদের সঙ্গে সমান আচরণ করতে এবং তাদের কিশোর-কিশোরী বয়সী সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করি। কিশোরীদের সঙ্গে পিরিয়ড এবং অন্যান্য নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতে আমি মায়েদের উৎসাহ দেই।”

কিশোর-কিশোরীরা মদিনার প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেয়, তিনি তাদের কাছাকাছি বয়সের এবং গাজীপুরে বেড়ে ওঠায় তিনিও তাদের মতো একই ধরনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন। তার মনে হয়, তিনি তার কমিউনিটির মধ্যে একটি পার্থক্য তৈরি করছেন।

তিনি বলেন, “আমি প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৫০ জন কিশোর-কিশোরীর প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলি এবং উঠোন বৈঠক করি। আমি যদি শিশুশ্রম, বাল্য বিবাহ বা নির্যাতনের কোনো ঘটনা পাই তবে আমি এটি কমিউনিটি ভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কমিটিকে (সিবিসিপিসি) জানাই এবং কমিটি আমার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে।”

২০ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবক মদিনা আক্তার ১৪ বছর বয়সী মো. রাহাত
UNICEF Bangladesh/2021/Satu
২০ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবক মদিনা আক্তার ১৪ বছর বয়সী মো. রাহাতের সঙ্গে তাদের কমিউনিটিতে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের যেসব বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে তা নিয়ে কথা বলেন।

স্থিতিস্থাপক কমিউনিটি গড়ে তুলতে সেবাগুলো শক্তিশালী করা

সম্মুখসারির কর্মীদের জন্য কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কমিউনিটিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে গাজীপুরে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিষেবাগুলো ধীরে ধীরে প্রাক-মহামারি পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা গেছে। টিকাদান কার্যক্রম ২০২০ সালের জুনের মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা গেছে এবং ২০২০ সালের নভেম্বরে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু শনাক্তকরণ ৬ হাজারে উন্নীত হয়েছে।

তবে বাংলাদেশজুড়ে কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দেওয়ায়, এই কষ্টার্জিত অর্জনগুলো নিয়ে ঝুঁকি রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে সফলতার জন্য তথ্যের বিশ্বস্ত উৎসগুলোর মাধ্যমে কমিউনিটিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিসেফের ময়মনসিংহ ফিল্ড অফিসের প্রধান ওমর ফারুক বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলা যাতে কমিউনিটিগুলো কোভিড-১৯-এর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতে মুখোমুখি হতে পারি এমন যে কোনো চ্যালেঞ্জ আমরা মোকাবিলা করতে পারি। যদিও মহামারি শেষ হতে এখনও অনেক দেরি, তা সত্ত্বেও আমরা বিশ্বাস করি যে, এই সমন্বিত পদক্ষেপ এবং কমিউনিটিগুলোর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে আমরা সঠিক পথেই আছি।"

৫ বছর বয়সী রিপা আক্তার
UNICEF Bangladesh/2021/Satu
গাজীপুরে শিশু অধিকার সুরক্ষার প্রতি প্রতিশ্রুতি দেখাতে নিজের কমিউনিটির জন্য একটি স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচিতে অংশ নেয় ৫ বছর বয়সী রিপা আক্তার।

কোভিড-১৯ চলাকালে গাজীপুরে সমন্বিত অপরিহার্য সেবাসমূহে সহায়তায় সুইডেন সরকারের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সিডার সহৃদয় অবদানের জন্য এই সংস্থাটির প্রতি ইউনিসেফ আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।