উঁচু ল্যাট্রিন ঘূর্ণিঝড় আম্ফান-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ করেছে

ঘূর্ণিঝড়ে পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ যখন তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে, ইউনিসেফের সহযোগিতায় নির্মিত উঁচু কাঠামোর ল্যাট্রিনগুলো তখনও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ কমিউনিটির মধ্যে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল

ইউনিসেফ
Bangladesh. After the cyclone Amphan
UNICEF Bangladesh/2020/Aronno
08 সেপ্টেম্বর 2020

২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে আঘাত হানে। কোভিড-১৯ মহামারীর ফলে ইতোমধ্যে ঝুঁকির মধ্যে থাকা প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল এই ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়টি ঘরবাড়ি, স্কুল ও চিকিৎসা কেন্দ্র ধ্বংস করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ফসল ও পানির সরবরাহ ব্যবস্থা। ঘূর্ণিঝড়ের পরে এখনও লক্ষ লক্ষ শিশুর জরুরি সহযোগিতার প্রয়োজন রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাড়িঘর হারিয়েছে। পরবর্তী মাসগুলোতে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্যানিটেশান সুবিধা নিশ্চিত করা। একদিকে কোভিড-১৯ এর হুমকি এবং অন্যদিকে অনেক কমিউনিটিতে ঘরবাড়ি, ল্যাট্রিন ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শিশুর স্বাস্থ্য এখন ডায়রিয়া এবং আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে।

সৌভাগ্যক্রমে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় এসব অঞ্চলের অনেক জায়গায় ইউনিসেফ উঁচু ল্যাট্রিন তৈরি করেছে। এ কারনে, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পরেও এই ল্যাট্রিনগুলোর অধিকাংশ এখনও টিকে আছে এবং তাদের পরিবার ও শিশুরা প্রতিদিন ল্যাট্রিনগুলো ব্যবহার করছে।

 

হাত ধোয়া এবং স্যানিটেশন সম্পর্কিত জীবন পরিবর্তনকারী শিক্ষা 

বরিশালের কাঁচা নদীর তীরে ছোট্ট একটি বাড়িতে স্বামী ও পাঁচ সন্তানের সাথে ৪৫ বছর বয়সী মরিয়ম বেগম বাস করেন। তার গ্রামে মাত্র আটটি পরিবারের বাস। কারন, বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে ঘরবাড়িগুলো সহজেই প্লাবিত হয়।

ইউনিসেফ-সমর্থিত ওয়াশ প্রকল্পের আওতায় এনজিও ফোরাম পরিচালিত হাত ধোয়া এবং স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন বিষয়ে প্রশিক্ষণ শুরুর আগ পর্যন্ত মরিয়ম এবং তার প্রতিবেশীদের হাত ধোয়া এবং স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিনের গুরুত্ব সম্পর্কে তেমন কোন জ্ঞান ছিল না।

বাংলাদেশ। উঁচু কাঠামোর ল্যাট্রিন
UNICEF Bangladesh/2020/Mansura NGO Forum
উঁচু কাঠামোর ল্যাট্রিন নির্মাণের গুরুত্ব সম্পর্কে মরিয়ম জানতে পেরেছিলেন। কারণ যে নিম্নাঞ্চলে মরিয়ম বাস করেন ঘূর্ণিঝড় এবং বৃষ্টিপাতের সময় তা প্রায়শই বন্যা কবলিত হয়। এতে করে স্যানিটেশন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়।

“আমার সন্তানরা সবসময়ই অসুস্থ থাকত। তারা প্রায়ই ডায়রিয়া বা আমাশয়ে ভূগতো। আমাদের নতুন ল্যাট্রিনের কারণে এখন আর তারা অতোটা অসুস্থ হয় না।”

মরিয়ম

কমিউনিটিতে পরিচালিত এসব সেশনের মাধ্যমে মরিয়ম উঁচু কাঠামোয় নির্মিত ল্যাট্রিনের গুরুত্ব সম্পর্কে শিখেছে। কারন, যে নিম্নাঞ্চলে মরিয়ম বাস করেন, ঘূর্ণিঝড় এবং বৃষ্টিপাতের সময় প্রায়ই তা বন্যা কবলিত হয়। এতে করে স্যানিটেশন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়।

বাংলাদেশের যে অঞ্চলে মরিয়মের বাস এমন অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল এদেশে রয়েছে যেখানে দারিদ্রের মধ্যে বসবাসরত মানুষ নিরাপদ পানির উৎস ও উন্নত ল্যাট্রিনের সুবিধা এবং ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার সময় কীভাবে এগুলো রক্ষা করা যায় সে সম্পর্কে সচেতন নয়।

এর ফলে বর্ষা মৌসুমে স্যানিটেশন লাইনগুলো যখন পানিতে নিমজ্জিত হয়, বা নলকূপগুলো ডুবে যায় এবং পানি দূষিত হয়ে যায় তখন প্রায়শই পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

মরিয়ম জানান, “আমাদের কমিউনিটির মানুষ নিরাপদ ল্যাট্রিন সম্পর্কে জানত না।” তিনি আরও বলেন, “ওয়াশ-এর কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত সেশনগুলো আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। পানির উৎসগুলো আগে কীভাবে দূষিত হয়েছিল সে সম্পর্কে আমরা এখন বুঝতে পারি।”  

ইউনিসেফ-সমর্থিত প্রকল্পটি উঁচু কাঠামোয় নির্মিত ল্যাট্রিন ও নলকূপ নির্মাণের সুবিধা এবং কীভাবে ও কখন হাত ধুতে হয় সে সম্পর্কেও মানুষকে জানিয়েছিল।

 

ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ

মরিয়ম ও তার স্বামী ইউনিসেফের সহায়তায় তাদের পুরানো ল্যাট্রিন নতুন করে নির্মাণের জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তারা উঁচু কাঠামোর ল্যাট্রিনটি পুনরায় নির্মাণ করেছিলেন। এই ল্যাট্রিনটিতে পানি রাখার জায়গা এবং পরিস্কার পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার একটি জায়গা করা হয়েছিল।

মরিয়ম বলেন, “আমার সন্তানরা সবসময়ই অসুস্থ থাকত। তারা প্রায়ই ডায়রিয়া বা আমাশয়ে ভূগতো। আমাদের নতুন ল্যাট্রিনের কারণে এখন আর তারা অতোটা অসুস্থ হয় না।”

তার কমিউনিটির অন্যান্য লোকজন যারা ২০১৯ সালের নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আগে উঁচু কাঠামোর ল্যাট্রিনগুলো পুনর্নির্মাণ করেছিলেন তাদের ক্ষেত্রেও পানিবাহিত রোগের ঘটনা খুব কম ঘটেছিল।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের ওয়াশ বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মনিরুল আলম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে এবং বাসস্থানসহ ওয়াশ অবকাঠামো যেসব স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ, দেশের এমন অনেক স্থানেই এখন এই প্রকল্পের অধীন উঁচু কাঠামোয় নির্মিত ল্যাট্রিনগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি আরও জানান, “বন্যার সময় ল্যাট্রিনগুলো রক্ষা করা এবং এগুলো যেন অচল হয়ে পড়ে না থাকে সে বিষয়ে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনা রয়েছে।”

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান যখন পিরোজপুরে আঘাত হেনে গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দিয়েছিল, সে সময় এসব ল্যাট্রিনের সুবিধা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তীব্র বাতাস এবং কাঁচা নদীর পানির স্তর সাত থেকে আট ফুট বৃদ্ধি পাওয়ায় ল্যাট্রিন ও পানির উৎসগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। 

মরিয়ম বেগমের উঠোন প্লাবিত হলেও, ল্যাট্রিনের কাঠামোটি উঁচু হওয়ায় সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই। পারিবারিক ল্যাটিনটি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর ছিল এবং মরিয়মের সন্তানরা প্রয়োজনমতো সেটি ব্যবহার করতে পারতো। এতে করে তারা নিরাপদ ও সুস্থ ছিল।

উন্নত টয়লেটটির সাফল্যের অর্থ হলো এটি মেরামতের জন্য মরিয়মের পরিবারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়নি। কোভিড-১৯ এর ফলে বিদ্যমান ঝুঁকির মধ্যে এটি তাদেরকে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ থেকে বাঁচিয়েছিল।