ইউনিসেফ: হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি

শূণ্য থেকে গড়ে তোলা একটি শিক্ষা কর্মসূচি

অ্যালেস্টার লসন ট্যানক্রিড
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু
UNICEF Bangladesh/2019/Sujan

03 ডিসেম্বর 2019

গত মে ২০১৯ সালে চালু হওয়া ইউনিসেফ-সমর্থিত শিক্ষণকেন্দ্রে নয় বছর বয়সী মাইমুনা ও এবং আট বছর বয়সী আর্টিকার মতো রোহিঙ্গা শরণার্থী বোনদের জীবনে নাটকীয় প্রভাব ফেলেছে।

ইউনিসেফের সহযোগী রিসদা পরিচালিত ১৫ নম্বর আশ্রয়কেন্দ্রের এই শিক্ষণকেন্দ্রে প্রথম বারের মতো তাদেরকে সপ্তাহের ছয় দিন এবং দিনে তিন ঘন্টা শ্রেণিকক্ষে অংশ নেবার সুযোগ দেওয়া হয়েছিলো।

রিসদা’র প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ আবু হানিফ সরকার বলেন, “২০১৯ সালের মে মাসে এই শিক্ষণকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে তারা যে অগ্রগতি সাধন করেছে তা দেখে আমি সত্যিই অভিভূত হয়েছি।”

তিনি আরো উল্লেখ করেন, “এর আগে শিশুদের জন্য পড়াশোনার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন তারা কায©করভাবে পড়তে, লিখতে এবং নিজেদের মধ্যে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে।”

১৫ নম্বর আশ্রয়কেন্দ্রের এই শিক্ষণকেন্দ্রের শিক্ষকদের মধ্যে দুই বোনের বড়ভাই ২১ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শরণার্থী মোহাম্মদ রফিক রয়েছেন।

এই কেন্দ্রটি খোলার ফলে একজন শিক্ষক হিসাবে কাজ করে তিনি নিজেও বেশ উপকৃত হয়েছেন।

গত আড়াই বছর ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউনিসেফ যে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে- তিন ভাইবোনের অভিজ্ঞতাতে সেটাই প্রতিফলিত হয়।  

শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন পাঠ্যপুস্তক এবং ইংরেজি এবং বার্মিজ শিক্ষকদের জন্য পাঠ পরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণ উপকরণসহ শিক্ষণকেন্দ্রে যে সব জ্ঞান বিতরণ করা হয় তা শিক্ষার মানের বেশ উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।

Maimuna and Artiqa with their teacher

১৯৪৭ সালে পরে বৃহত্তর গণ-জাগরণ

আগষ্ট ২০১৭ সালের আগষ্ট মাস থেকে মায়ানমার ছেড়ে পালিয়ে আসা হাজার হাজার রোহিঙ্গা শিশু এখন শ্রেণিকক্ষে অংশ নিচ্ছে। এটি বাংলাদেশকে একটি বড় মানবিক ও আর্থিক সংকটে ফেলে দিয়েছিলো। ৬০ বছর আগে ভারত বিভক্ত হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ায় এটি ছিল বৃহত্তম গণ-প্রবাহ।

মিয়ানমারে সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে অর্ধ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে চলে এসেছিলো। শরণার্থীর এই সংখ্যা ধরে ধীরে সাত লাখ পয়তাল্লিশ হাজারে পৌঁছেছিলো। এদের সকলেই অপ্রস্তুতভাবে আশ্রয় চেয়েছিলো।

সহায়তা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির প্রয়োজনের প্রতি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে হিমশিম খেয়েছিলো। কারন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের নিঃস্ব প্রতিবেশীদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিলো।

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু
UNICEF Bangladesh/2019/Sujan

শুরুতেই, মৃত্যু ও রোগের প্রকোপ রোধে পানীয় জল, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন রোগের ভ্যাকসিন সরবরাহ করার মতো জীবন রক্ষাকারী পরিসেবাসমূহের উপর মনোযোগ দেওয়া হয়েছিলো। 

কিন্তু আজ, সরবরাহকৃত পরিষেবার মান উন্নত ও জোরদার করার দিকে জোর দেওয়ার ফলে মানবিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে।

সংকটের প্রথম মাসগুলিতে আশ্রয়কেন্দ্রের অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিলো নিরাপদ এবং আরও সুরক্ষামূলক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অবিশ্বাস্য যন্ত্রণা ভোগ করা শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও জোরদার করা।


আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ইউনিসেফের শিক্ষার বিধান

২০২০ সালের জন্য পরিকল্পিত আরও ৫০০ টি শিক্ষণ কেন্দ্রসহ ২৫০০ শিক্ষণ কেন্দ্র। 

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৭৪ টি বহুমুখী কেন্দ্র যা ১৩,১০৯ জন কিশোর-কিশোরীকে সহযোগিতা দিচ্ছে।

দক্ষতা কাঠামো ও পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চার হাজার আটশত শিক্ষক যারা শিক্ষণকেন্দ্র ব্যবহার করতে পারে।

আশ্রয়কেন্দ্রের অন্তত দুই লক্ষ চৌদ্দ হাজার শিশু ইউনিসেফ-সমর্থিত শিক্ষণকেন্দ্র এবং বাড়ি-ভিত্তিক শিক্ষণ সুবিধা গ্রহণ করছে।

ইউনিসেফের সুবিধা গ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ মেয়ে এবং ০.৩ শতাংশ প্রতিবন্ধী।


যেহেতু বাংলাদেশ বা মিয়ানমার কোনো দেশের পাঠ্যক্রমই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অনুমোদিত নয়, সে কারনে ইউনিসেফ এগুলোর পরিবর্তে শিক্ষণ দক্ষতা কাঠামো এবং পদ্ধতি (এলসিএফএ) নামে পরিচিত একটি অনানুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রম চালু করেছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু
UNICEF Bangladesh/2019/Sujan

এই এলসিএফএ এখন সকল আশ্রয়কেন্দ্রে ক্রমশই চালু হচ্ছে। এটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জাতীয় পাঠ্যক্রমের সাথে হাল্কাভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। ইংরেজি এবং বার্মিজ ভাষায় চার থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রস্তুতকৃত পাঠসহ পাঠদান এবং শিক্ষণ উপকরণগুলির একটি কাঠামোগত সেট রয়েছে এই পাঠ্যক্রমে।

ফলস্বরূপ শিক্ষকরা এখন পাঠ-পরিকল্পনাসহ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাক্রম নিয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলী দ্বারা অব্যাহতভাবে তদারকি করা হচ্ছে।

মাইমুনা ও আর্টিকার মতো শিক্ষার্থীরা আজ গণিত, বার্মিজ, ইংরেজি ও জীবনমুখী দক্ষতা (১ম ও ২য় পর্যায়ের জন্য) এবং বিজ্ঞানের (৩য় ও ৪_© পর্যায়ের জন্য) মতো বিষয়গুলো পড়ছে। বিশাল এই আর্থিক চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন অংশীদারদের - বিশেষত বাংলাদেশী এনজিওগুলির- অবদান অপরিসীম।

সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ইউনিসেফ আরও অন-জব মেন্টরিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রুপ এবং পেশাদার উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি মেটানোর ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে। সম্প্রতি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শিশু এবং কিশোর কেন্দ্রগুলির বহুমুখী নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে এবং এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আরো বিস্তৃত শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে।
 
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের উন্নত শিক্ষার সুযোগের পক্ষে ইউনিসেফ তাদের প্রচার অব্যাহত রেখেছে, এবং বর্তমান অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় রোহিঙ্গা শিশুদের দ্বারা প্রাপ্ত শিক্ষার ফলাফলগুলি মূল্যায়ন ও প্রত্যয়ন করার বিকল্পগুলির অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পরিচালিত সবচেয়ে বিস্তৃত একাডেমিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বয়স বিবেচনায় না নিয়ে শিশুদের তাদের নিজেদের একাডেমিক দক্ষতা অনুযায়ী ক্লাসে স্থান দেওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি। মূল্যায়নের ফলাফল অনুযায়ী আশি হাজার রোহিঙ্গা শিশুকে তাদের দক্ষতা অনুযায়ী ক্লাসে রাখা হয়েছিল। যে সব শিশু ঐ তারিখের পরে শিক্ষণকেন্দ্রে অংশ নিতে শুরু করেছে, তাদেরকে মূল্যায়ন করা হয় নি। 

মাইমুনা এবং আর্টিকার মতো শিশুদের জন্য ২০১৭ সালের অন্ধকার দিনগুলি অনেক দূরে।
______________________________________________________________________________ 
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলিতে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশোনার বিষয়ে ইউনিসেফের প্রচারের অবস্থান সম্পর্কে আরো তথ্যের জন্য, অনুগ্রহ করে আমাদের আগস্ট ২০১৯-এ প্রকাশিত প্রচার সতর্কতা দেখুন (বিশেষ করে ১৮-১৯ এবং ৩৮-৩৯ নম্বর পাতা দেখুন)।

বিওন্ড সারভাইভাল: রোহিঙ্গা রিফিউজি চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ ওয়ান্ট টু লার্ণ

 

ইউনিসেফকে আরও জানুন