ইউনিসেফের নিরাপদ স্থানে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি মেয়েদের বন্ধন

এই সেফ স্পেস বা নিরাপদ স্থানটি একটি স্থাপনার চেয়ে বেশী কিছু, এটি এমন একটা জায়গা যেখানে বিভিন্ন কমিউনিটির নারী ও মেয়েরা খুঁজে পায় শান্তি এবং বন্ধুত্ব

কেটি জিন
নারী ও মেয়ে শিশুদের জন্য নির্মিত ইউনিসেফ-এর সেফ স্পেস বা নিরাপদ স্থান
UNICEF Bangladesh/2019/Kettie Jean

09 মার্চ 2020

বিস্তৃীর্ণ মাঠের মধ্যে স্থাপিত বাঁশের তৈরি আকর্ষণীয় এই কাঠামোটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রের একটি অংশ। এটা নারী ও মেয়ে শিশুদের জন্য নির্মিত ইউনিসেফ-এর সেফ স্পেস বা নিরাপদ স্থান।

২০১৯ সালের অক্টোবরে মুলত রোহিঙ্গা নারী ও মেয়ে যারা ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সেবা প্রদানের লক্ষেই এই নিরাপদ স্থানটি উদ্বোধন করা হয়। তবে স্বাগতিক কমিউনিটির অনুরোধের প্রেক্ষিতে, এটা এখন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি দুই সম্প্রদায়ের নারী ও মেয়েদের জন্যই উন্মুক্ত।     

ইউনিসেফ-এর সেফ স্পেস বা নিরাপদ স্থান

“কীভাবে এই কেন্দ্র বা সেন্টারটি তৈরি করলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির কাছে ভাল লাগবে, সে বিষয়ে তাদের মতামত সংগ্রহের জন্য আমরা যখন জরিপ করছিলাম, তখন আশেপাশে বসবাসরত বাংলাদেশী নারী ও মেয়েরা এই স্থানের বিষয়ে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল,” বলেন রিজভী, ইউনিসেফের অংশীদার ব্রাক-এর একজন স্থপতি এবং এই নিরাপদ স্থানটির অন্যতম একজন ডিজাইনার।

আন্তঃ-কমিউনিটি বন্ধুত্ব

“আমি এই সেন্টারটি তৈরি হতে দেখেছি এবং আমি সত্যিই এখানে আসতে চেয়েছিলাম,” জানায় ১৬ বছর বয়সী বাংলাদেশী মেয়ে সাজেদা যে সেন্টারটির কাছেই থাকে।

নিরাপদ স্থানটি উভয় সম্প্রদায়ের নারী এবং মেয়েদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছে।

সেন্টারটিতে আসার পর থেকে সাজেদার সাথে ১৬ বছর বয়সী রোহিঙ্গা মেয়ে ফাতিমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। তারা দুইজন একসাথে টেইলারিং-এর ক্লাশে অংশ নেয়।

সাজেদা আরও জানায়, “এই কোর্সটি শেষ করার পর আমি আমার পরিবারের পোষাক নিজেই মেরামত করতে এবং অর্থ সাশ্রয় করতে পারবো।”

ফাতিমাও দৃঢ়তার সাথে তার ইচ্ছার কথা জানায়, “সেলাইয়ের ব্যবসা করার মাধ্যমে আমি স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখি।”

রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশী উভয় সংস্কৃতিতেই, নারী ও মেয়েদের জন্য অনেক ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে। বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে এই সামঞ্জস্যতাই ফাতিমা ও সাজেদাকে একে অন্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। 

ফাতিমা বলে, “আমাদের দুজনের কেউই সত্যিকার অর্থে ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে যেতে পারি না।”

সাজেদা ও ফাতেমা
UNICEF Bangladesh/2019/Kettie Jean
সেলােই প্রশিক্ষণ ক্লাশে ফাতিমা (বাম) ও সাজেদা (ডানে)

সেবা ও আনন্দের মিশ্রণ

ফাতিমার জন্য বাড়িতে থাকার একমাত্র বিকল্প হলো এই নিরাপদ স্থানটি। তার মতো অল্পবয়সী রোহিঙ্গা মেয়েদের জন্য এর বাইরে তেমন কোনো বিকল্প নেই। কারন, শিক্ষাকেন্দ্রগুলো তার চেয়ে নিচের ক্লাশের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দেয়। কিন্তু অচিরেই ফাতিমা ক্লাশে যাওয়া বন্ধ করবে। কারন তার বাবা-মা আর তার পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছে না। এটা কক্সবাজার জেলার বাংলাদেশি কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রেও একটা সাধারন সমস্যা।  

নিরাপদ এই স্থানটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিশেষত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে দুটি মেয়েই ‘উঠোন’ বলে সমস্বরে চিৎকার করে উঠে। “কারন, আমরা এখানে খেলতে পারি।”

নতুন সেন্টারের বিষয়ে পরিকল্পনা করার সময় স্থাপনাটির কাঠামো নির্মাণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত দলটি আশ্রয়শিবিরের একাধিক নিরাপদ স্থান পরিদর্শন করেছে। সেন্টার সম্পর্কে রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েরা কী পছন্দ করে এবং আরো কী কী উন্নত করা যায় - তা খুঁজে বের করার জন্য একাধিক সেন্টার পরিদর্শন করা হয়েছিল।

সেন্টারটির নকশার সাথে সম্পৃক্ত সাদ নামের আরও একজন স্থপতি বলেন, “নারী ও মেয়েরা কী চায় সে সম্পর্কে আমরা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এবং তারা বলেছিল যে, তারা সেন্টারটির ভেতরে একটি উঠোন চায়।

ইউনিসেফ-এর সেফ স্পেস বা নিরাপদ স্থান
BRAC/Rizvi Hassan

নিরাপদ এই স্থানটিতে আসা যাওয়া করে এমন নারী ও মেয়েদের কাছে স্থানটি শুধুমাত্র ভৌত কাঠামোর চেয়ে বেশি কিছু। এটি এমন একটি অভয়ারণ্য যেখানে তারা শান্তি খুঁজে পায়, একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয় এবং নতুন দক্ষতা অর্জন করে। এই কেন্দ্রটি বিভিন্ন ধরণের সেবা যেমন পরামর্শ, মনস্তাত্বিক সহায়তা, জীবন দক্ষতা এবং মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত উপকরণের ব্যবস্থা করে। এই কেন্দ্রে গোছল করার এবং হাত-মুখ ধোয়ার স্থানও রয়েছে।

রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রে রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েরা যৌথ ল্যাট্রিন ব্যবহার করার ক্ষেত্রে প্রায়শই নিরাপদ বোধ করেন না। আশ্রয়কেন্দ্রে গোপনীয়তার অভাবে তারা বিব্রত বোধও করেন। ল্যাট্রিন ব্যবহার করার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় কখনও কখনও তারা হয়রানির শিকারও হন। নিরাপদ স্থানটিতে স্যানিটেশন সুবিধা থাকার ফলে তারা আর বিব্রত বোধ করেন না এবং বাংলাদেশী নারী ও মেয়েদের সাহায্য করার সময় এটি তাদেরকে মর্যাদাপূর্ণ ভাবতে সাহায্য করে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী
UNICEF Bangladesh/2019/Kettie Jean

সমান উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি

এই সেন্টারের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো এখানে বাংলাদেশী নারীরা কাজ করে এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নারী স্বেচ্ছাসেবীরা এই কেন্দ্রটির কাজকম© দেখাশোনা করেন এবং এটি পরিচালনা করেন।

বাংলাদেশের ভোলা জেলার মেয়ে সুমি এই নিরাপদ স্থানটি দেখাশোনা করে এবং এর থেকে সে যা আয় করে তা দিয়ে তার পরিবারকে সহযোগিতা করে। সুমি জানায়, “এখানে কাজ করার জন্য আমি গর্বিত। আমি যা করি তা আমি পছন্দ করি এবং আমি আমার মতো অন্যান্য মেয়েদের সাহায্য করতে পছন্দ করি”

রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশী নারী ও মেয়েদের একত্রীকরণ অপ্রত্যাশিত হলেও বিষয়টিকে এই কেন্দ্রের সবাই স্বাগত জানিয়েছে। যখন স্থানীয় জনগোষ্ঠি ও রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমবর্ধমান, সেরকম একটা পরিপ্রেক্ষিতে শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি স্থাপনে নারী ও মেয়েরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বন্ধুত্ব ও দৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসাবে এই সেন্টারটি কাজ করে।

নিরাপদ স্থানটি যৌথভাবে অর্থায়ন করেছে কানাডীয় সরকার, কোরিয়া সরকার, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ (ডিএফআইডি) এবং কেএফডব্লিউ ব্যাংকের মাধ্যমে জার্মান সরকার।

বিঃদ্রঃ গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে কিছু নাম এবং শনাক্তকরণ বিবরণ পরিবর্তন করা হয়েছে।

ইউনিসেফকে আরও জানুন