আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক শিশু কেন্দ্রগুলোতে শারীরিক দূরত্ব “কোনো বিকল্প নয়”

প্রতিষ্ঠানে থাকা শিশুদের কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা উপায় বের করা

ইউনিসেফ
A child
UNICEF/UNI107596/Omi
15 এপ্রিল 2020

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে টঙ্গী অঞ্চলের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বিচারের অপেক্ষায় থাকা বা সাজার ভোগ করা ছেলেদের জন্য কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা অসম্ভব। যদিও এই কেন্দ্রটি সরকারের সামাজিক সেবা বিভাগ দ্বারা পরিচালিত হয়, তা সত্ত্বে সেখানে কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম শক্তিশালীকরণে এবং শিশুদের যত্ন ও সুরক্ষার ন্যূনতম মান নিশ্চিতকরণে ইউনিসেফ সহায়তা দেয়।

অতীতে কিশোর সংশোধন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্রটি অত্যন্ত জনাকীর্ণ, যেখানে প্রায় ৩০০ জনের জন্য নির্মিত কোয়ার্টারে থাকছে ৬৫০ এর বেশি ছেলে।

ভাইরাসের বিস্তার রোধে শারীরিক দূরত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি এক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত বিকল্প নয়। এই কেন্দ্র অত্যন্ত সংক্রামক করোনাভাইরাসের আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র হতে পারে, যা খুব দ্রুত এই কেন্দ্রকে আক্রান্ত করতে পারে।

ইউনিসেফ কর্তৃক নিয়োজিত এই কেন্দ্রের মনো-সামাজিক পরামর্শদাতা শরিফুল ইসলাম বলেন, “আইনত ছেলেরা এখানে থাকতে বাধ্য। তবে আমরা চেষ্টা করি যাতে তারা এখানে নিজেদের বন্দী মনে না করে, যদিও এখানে তারা যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করতে পারত, করোনাভাইরাস থেকে তাদের সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে তা অনেকাংশেই কমানো হয়েছে।

“সত্যি বলতে, এই আপদকালীন সময়টাতে আমার কাজটি অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে বলেই আমার মনে হয়। ছেলেরা খবর দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তবে আমি তাদের বলি যে, তারা দেশের বেশিরভাগ মানুষের চেয়ে এখানে নিরাপদে আছে এবং তাদের সঠিকভাবে নিজেদের হাত ধুতে এবং যতটা সম্ভব শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলি।”

এখানকার ছেলেদের বেশিরভাগই কিশোর এবং টিনএজের শুরুর দিকের, যারা শিশু আদালতে বিচারাধীন এবং এদের মধ্যে কেবলমাত্র হাতে গোনা কয়েকজন অন্তরীণ অবস্থায় সাজা ভোগ করে।

ছদ্মবেশে আশীর্বাদ

১৪ বছর বয়সী তারা মিয়ার* জন্য শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বাধ্যতামূলক থাকার এই ব্যবস্থাটি ছদ্মবেশে আশীর্বাদ হতে পারে, যেখানে সে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আছে।

মহামারির প্রাদুর্ভাবের সময়ে শারীরিক দূরত্ব এবং ঘরের ভেতরে দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রসিকতা করে সে বলে, “আমাদের অন্তত অপরিচিত কারও মুখোমুখি হওয়ার এবং রোগে সংক্রমিত হওয়া নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। এই জায়গাটি আমাদের যথাযথভাবে আলাদা করে রেখেছে। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও আমাদের দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে এটি আমাদের সবার জন্যই ভালো।”

জনাব ইসলাম জানান, বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পরপরই এই কেন্দ্রে ছেলেদের আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্ন করে রাখার নিয়ম চালু করা হয়।

ছেলেদের তাদের বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার করার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তাদের আদালতের শুনানিতে অংশ নিতে দেওয়া হয়না এবং এই স্থাপনার এক ভবন থেকে অন্য ভবনে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবারই তাদের বাধ্যতামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে হাত ধোয়ার নিয়ম মেনে চলতে হয়।

হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই

কেন্দ্রে দায়িত্বরত সমাজ কর্মীরা স্বাস্থ্যবিধি ঠিক রাখার পাশাপাশি ছেলেদের ব্যস্ত রাখতে সচেষ্ট থাকেন। এই কেন্দ্রটিকে উল্লেখযোগ্যমাত্রায় আরও শিশু-বান্ধব করে তুলতে সেবাসমূহ এবং নিয়মনীতি পুরোপুরিভাবে ঢেলে সাজানোসহ শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও যত্নের ব্যবস্থা সম্পর্কে ইউনিসেফ কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার আগ পর্যন্ত এই কেন্দ্রটির কার্যপদ্ধতি ছিল একেবারেই ভিন্ন।

ইউনিসেফ আটক শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও সামাজিক সেবাসমূহ নিশ্চিতে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি কেন্দ্রগুলোতে জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চালু করেছে এবং কিশোর-কিশোরীদের সহিংসতার আশঙ্কা না করে বিভিন্ন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে তাদের ভেতরে থাকা সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সহায়তা প্রদান করে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির অংশ হিসেবে ইউনিসেফ শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রগুলো উন্নত করতে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে।

গত কয়েক বছরে ইউনিসেফের আয়োজনে একাধিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা কর্মকর্তাদের একজন হচ্ছেন জনাব ইসলাম। কাজের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি তাকে যা শেখানো হয়েছে তা প্রতিফলিত করে, যা তাকে এবং তার সহকর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কে জ্ঞান সরবরাহ করে।

“আমরা তাদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করি। কোনও ছেলের পক্ষে, বিশেষ করে এধরনের সময়ে, হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়া, নিরাপত্তাহীনতা বোধ করা বা হিংস্র হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমরা যখন এ জাতীয় কিছু লক্ষ্য করি, তখন তাদের সঙ্গে আমরা ব্যক্তিগতভাবে কথা বলি।

“কৌশলটি হচ্ছে তাদের ব্যস্ত রাখা। উদাহরণস্বরূপ, হলরুমগুলোতে ঘণ্টাব্যাপী কাউন্সেলিং সেশনের সময় আমি তাদের ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে, মনোযোগ বাড়াতে, মেডিটেশন করতে এবং পেশী শিথিলকরণের অনুশীলন করতে বলি। এই ব্যয়াম ও শরীর চর্চাগুলো কাজে দেয় এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে এগুলো করা যায়।”

প্রতিরোধ ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা

এই উদ্বেগাকুল ও অনিশ্চিত সময়ে ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুরা যাতে নিরাপদ, সুস্থ ও সুরক্ষিত বোধ করে তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এই কেন্দ্রে আসার পর বেশিরভাগ ছেলেই প্রথম যার সঙ্গে পরিচিত হন তিনি হলেন সমাজকর্মী রেহানা বানু মুন্নি। তিনি সেখানকার কর্মরত তিনজন সমাজ কর্মীর একজন।

“আমি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের গ্রহণ করি এবং তাদের প্রত্যেকের জন্য একটি ফাইল খুলি। প্রায়শই নবাগতরা আমাদের জানায় যে, কয়েক বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই।”

তিনি বলেন, “কেউ কেউ এমনকি তাদের বাবা-মায়ের ফোন নম্বর পর্যন্ত মনে করতে পারে না। খুব কম তথ্যের ভিত্তিতে, যদি থাকে, আমরা তাদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজ করি।”

Social worker Rehana Banu Munni
UNICEF Bangladesh/2020/Khaliduzzaman
ছেলেদের আরও ভালোভাবে জানার মাধ্যমে তাদেরকে ভালো স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে কিছু বাড়তি পাঠ দিয়ে কোয়ারেন্টাইনে থাকাকালীন সময়ের সর্বোচ্চ সদ্যবহার করছেন সমাজকর্মী রেহানা বানু মুন্নি।

ছেলেদের আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য মিস মুন্নি আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ইউনিসেফের সহায়তায় অন্তরীন শিশুদের মুক্তি বা জামিনের উপায় খুঁজতে শিশু আদালতে বিচারাধীন কম গুরুতর মামলাগুলো পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থার সুবিধা গ্রহণের সুযোগ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হয়।

মিস মুন্নি বলেন, “বেশিরভাগ কাজই বাইরে যাওয়া ও ভ্রমণ সম্পর্কিত। তবে সরকার সবাইকে বাড়ির ভেতরে থাকতে বলার পর থেকে এই কার্যক্রমগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।”

তবে তিনি মনে করেন মহামারীটির একটি ভালো দিক হচ্ছে, এটি তাকে ছেলেদের আরও ভালোভাবে জানার এবং তাদেরকে ভালো স্বাস্থ্যবিধি ও শারীরিক দূরত্ব সম্পর্কে শেখানোর দারুণ সুযোগ করে দিয়েছে। কেন্দ্রটি সম্প্রতি এমন ব্যবস্থা চালু করেছে যাতে এখানে আগত নতুন কাউকে প্রথম ১৪ দিন আলাদা রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।

মিস মুন্নি বলেন, “এদিকে যারা এখানে আছে তাদের প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়া দরকার। তারা যাতে নিরাপদে থাকতে পারে তা নিশ্চিত করতে আমাদের অবশ্যই অবশ্যই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। একইসঙ্গে তারা যাতে আতঙ্কিত হয়ে না পড়ে সেটাও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।”

এই কেন্দ্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে ছেলেদের পুনর্বাসিত করা এবং হয় তাদের পরিবারের সাথে পুনরায় একত্রিত করা বা তাদের বাইরের বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করা। মিস মুন্নি জানান, যেহেতু কোভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি বেশি সময় ধরে তাদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারছেন, ফলে কঠিন এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাদের মাঝে প্রতিরোধ ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার জন্যও তিনি বাড়তি সময় পাচ্ছেন।

*শিশুটির সুরক্ষার স্বার্থে তার নাম বদলে দেওয়া হয়েছে