কোভিড-১৯ ও টিকা দান: অভিভাবকদের যা জানা প্রয়োজন

কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিভাবে নিরাপদে আপনার শিশুকে নিয়মিত টিকা দেবেন

ইউনিসেফ
শিশুকে টীকা দেয়া হচ্ছে
UNICEF/BANA-2020/Himu

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি বিশ্বব্যাপী ভীতিকর ও অনিশ্চিত এক পরিস্থতি তৈরি করেছে। অনেক অভিভাবক জানতে চাইছেন, কবে আসবে কোভিড-১৯ এর টিকা? এই মহামারির সময়ে সন্তানের নিয়মিত টিকা নেওয়ারই বা কি হবে? এখানে আমরা এই সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে চেষ্টা করেছি।

কবে পাওয়া যাবে করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) টিকা?

এখন পর্যন্ত (২৩ এপ্রিল) বিশ্বে করোনাভাইরাসের কোনো টিকা বা প্রতিষেধক নেই। গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা প্রাণঘাতী এই রোগের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে টিকা আবিষ্কারের জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বেশ কিছু টিকা পর্যায়ক্রমে তৈরির পর্যায়েও রয়েছে; তবে সেগুলোর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে দুটি। করোনাভাইরাসের টিকা তৈরিতে বিজ্ঞানীরা তাদের সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগাচ্ছেন। এক্ষেত্রে ইবোলা ও সার্স ভাইরাসের টিকা তৈরির অভিজ্ঞতা তারা মাথায় রাখছেন। যদি তারা এতে সফল হন, তবে এটাই হবে ইতিহাসে প্রথম দ্রততম সময়ে কোনো ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার ও পরীক্ষার ঘটনা।

গবেষকরা অবশ্য মানুষের শরীরে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার গতি কমিয়ে আনা এবং এর ফলে রোগীর যে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তা প্রশমণে কার্যকর ওষুধের সন্ধান করছেন। কিন্তু নতুন এই রোগের চিকিৎসায় মানবদেহে কোন ওষুধ প্রয়োগের আগে তার কার্যকারিতা ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেও কি আমার সন্তানকে নিয়মিত টিকা দেওয়া উচিত?

কোভিড-১৯ আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপন ব্যাহত করলেও, এই প্রশ্নের এক কথায় উত্তর হলো -- হ্যাঁ। যেখানে সেবাটি মিলছে সেখান থেকে আপনার সন্তানকে টিকা দেওয়ার চেষ্টা করুন। শিশু ও নবজাতককে সঠিক সময়ে তাদের টিকাগুলো দিয়ে ফেলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, ওইসব টিকা তাদের জটিল রোগ থেকে রক্ষা করে। এর অর্থ হলো, আপনার সন্তান যখন অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে যাবে, তখন কিছু রোগের সংক্রমণ থেকে তারা সুরক্ষিত থাকবে।

কোথা থেকে টিকা নেবেন আপনি যদি তা না জানেন অথবা টিকাদান কার্যক্রম যদি চালু না থাকে, তবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর স্মরণাপন্ন হোন। কারণ, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছে এবং আপনি দেখবেন, আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সেবা প্রদান পদ্ধতিও বদলে ফেলছেন। আপনার শিশুর নির্ধারিত পরবর্তী টিকা নিতে আপনি যদি ক্লিনিকে যেতে না পারেন; তবে এই সেবা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার চেষ্টা করার জন্য কোথাও একটি নোট লিখে রাখুন।

করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি? অন্যান্য রোগ ও টিকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে এটি আমাদের কী শিক্ষা দিতে পারে?

টিকা কতটা মূল্যবান তা এই করোনাভাইরাসের মহামারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। মহামারির এই মহামারি পরিস্থিতি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, যখন কোনো রোগের টিকা থাকে তখন অবশ্যই শিশু ও আমাদের নিজেদের যথা সময়ে সেই টিকা নেওয়া উচিত। আর টিকা নেওয়া না থাকলেই মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। যেমন, হাম ও অন্য কিছু রোগ এখনো মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আমরা খুবই ভাগ্যবান যে, এসব রোগের টিকা রয়েছে।

টিকা কিভাবে কাজ করে?

টিকা আমাদের শরীরে একটি জীবাণুকে (ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাস) নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমে তার সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে সহায়তা করে। যতক্ষণ ওই জীবাণু নিষ্ক্রিয় থাকে ততক্ষণ সেটি আমাদের অসুস্থ করতে পারে না। মোট কথা, টিকা আমাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে। এরপর কোন জীবাণু যদি আবার আপনাকে সংক্রমণ করে, তবে তাতে ভয়ের কিছু নেই, কেননা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জানে কীভাবে তার সাথে যুদ্ধ করতে হবে।     

শিশুকে টীকা দেয়া হচ্ছে
UNICEF/UN0155470/Sujan

বিভিন্ন টিকা সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য আমি কোথায় পাবো?

এজন্য আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট দেখুন এবং ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

কোভিড-১৯ থেকে আমি কিভাবে নিজেকে ও অন্যদের রক্ষা করতে পারি?

কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে সাহায্য করতে পারে। যেমন --

  • সাবান ও পানি দিয়ে বার বার হাত ধুয়ে ফেলুন অথবা অ্যালকোহল-যুক্ত তরল হাতে মাখুন।
  • মুখমণ্ডল স্পর্শ করা পরিহার করুন, বিশেষ করে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না।
  • হাঁচি বা কাশি এলে হাতের কনুই অথবা টিস্যু দিয়ে মুখ ঢাকুন। ব্যবহৃত টিস্যু তৎক্ষণাৎ নির্ধারিত ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিন।
  • জনবহুল স্থান ও মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। খাবার, প্লেট, কাপ ও তোয়ালে ভাগাভাগি করা পরিহার করুন।
  • ফোন, দরজার হাতল, লাইটের সুইচ, রিমোট কন্ট্রোলসহ যেসব জিনিস বারবার স্পর্শ করা হয় সেগুলো পরিষ্কার ও জীবাণূমুক্ত করুন।
  • অসুস্থ বোধ করলে বাসায় অবস্থায় করুন, এমনকি যদি হালকা জ্বর ও সর্দি হয়।  
  • হাঁচি ও কাশি হলে অথবা কোভিড-১৯ আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে এমন কারো সেবা করার সময় মাস্ক ব্যবহার করুন। তবে স্বাস্থ্যকর্মীরা অবশ্যই মেডিকেল মাস্ক পরবেন।    

আমার সন্তানের বয়স এক বছর। কিভাবে আমি আমার সন্তানকে কোভিড-১৯ থেকে রক্ষা করব?

হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার ব্যাপারে মা-বাবাদের যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, এর বাইরেও নবজাতকের সুরক্ষায় তাদেরকে বাড়তি কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সম্ভব হলে আপনার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান। বুকের দুধের মাধ্যমে এই ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে এমন কোন তথ্যের সত্যতা এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণায় প্রমানিত হয়নি। তবে আপনার অবশ্যই স্বাভাবিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা উচিত। শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে সংক্রমণ এড়াতে (বুকের দুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি অন্য সময়) সুরক্ষা ব্যবহার করতে হবে। সম্ভব হলে শিশুর ডায়াপার পরিবর্তন করে দিনে অন্তত একবার ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধক টিস্যু দিয়ে মুছে দিন।

বেশি লোকজনের নবজাত শিশুর সংস্পর্শে আসা কমানোর জন্য একই সেবা প্রদানকারীর সেবা নেওয়া নিশ্চিত করুন। সেবা প্রদানকারীদের নিয়মিত হাত পরিষ্কার করতে উৎসাহিত করুন। একই জিনিসে অনেকে মুখ দেওয়া (যেমন কাপ) পরিবহার করুন এবং সেবা প্রদানকারী যদি একটুও অসুস্থ বোধ করেন তবে তার কাছ থেকে দূরে থাকুন।

আমার সন্তানের মধ্যে যদি কোভিড-১৯ সংক্রমণের লক্ষণ দেখা যায় তখন আমার কি করা উচিত? তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া কি নিরাপদ?

আপনার সন্তানের যদি গলা ব্যথা হয়, সর্দি অথবা জ্বর দেখা যায়, তবে তাকে চিকিৎসক অথবা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর কাছে নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলুন। অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ঠেকাতে ক্লিনিকে বিশেষ ব্যবস্থা থাকলেও থাকতে পারে। আপনার সন্তানের মধ্যে করোনার মারাত্মক লক্ষণ দেখা দিলে, যেমন শ্বাসকষ্ট অথবা অস্বাভাবিক অসুস্থ হয়ে পড়লে, কাছাকাছি কোনো হাসপাতালে নিতে জরুরি নম্বরে ফোন দিন।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত বেশিরভাগ শিশুরই খুব সামান্য লক্ষণ দেখা গেছে। এমনকি অনেকের ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। কিন্তু বয়স্ক ও ঝুঁকপূর্ণ অবস্থায় থাকা অন্যদের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং যদি মনে করেন, আপনার শিশু কোভিড-১৯ আক্রান্ত অথবা তার মধ্যে এর লক্ষণ রয়েছে, তবে তাকে বাড়িতে রাখুন। কিন্তু প্রয়োজনে তার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ গ্রহণ নিশ্চিত করুন।

আপনার ও আপনার সন্তানের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের অন্য সংক্রমণ যেমন -- ফ্লু দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ নিন। জনসমাগম স্থলে (যেমন- কর্মক্ষেত্র, স্কুল ও গণপরিবহন) না যাওয়ার চেষ্টা করুন। বয়স্কদের সংস্পর্শে আসবেন না অথবা পরিবারে যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই তাদের এড়িয়ে চলুন। আপনি যদি কোন বয়স্ক লোকের সঙ্গে থাকেন, তবে পরিবারের ছোটদের তার কাছ থেকে দূরে রাখুন।

আমার সন্তানের কি করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরীক্ষা করা উচিত?

আপনার সন্তানের মধ্যে যদি কোনো লক্ষণ (যেমন- জ্বর, সর্দি অথবা শ্বাসকষ্ট) না থাকে এবং সে যদি সুস্থ থাকে, তবে তার করোনাভাইরাস পরীক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং কোভিড-১৯ থেকে আপনার পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগুলো গুরুত্বসহকারে মেনে চলুন।

আরও জানুন